‘পানি শুধু ঘর ভাসিয়ে নেয়নি, বাপ-দাদার শেষ স্মৃতিটুকুও কেড়ে নিয়েছে।’ কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ৪ নম্বর বাহারচড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বাকি বিল্লাহ চৌধুরী। টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় এবার শুধু বসতঘর নয়, ভেসে গেছে বহু পরিবারের কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি, আজীবনের সঞ্চয় আর জীবনসংগ্রামের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকা ঘরবাড়িও।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজানের বিভিন্ন গ্রামে দেখা যায়, পানি কমতে শুরু করলেও চারদিকে ধ্বংসস্তূপের চিত্র। কাদামাটিতে ঢেকে আছে ঘরবাড়ি। ভেঙে পড়েছে অসংখ্য মাটির ঘর। কোথাও ঘরের দেয়াল নেই, কোথাও টিনের চালা উড়ে গেছে। আবার কোথাও শুধু ভিটেটুকুই পড়ে আছে।

jagonews24বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কাঁচা ঘর, ধসে পড়েছে দেয়াল ও বসতভিটার একাংশ

সবচেয়ে বেশি কষ্টের গল্প শোনাচ্ছেন প্রবীণরা। অনেকের চোখে পানি শুধু ঘর হারানোর জন্য নয়, বরং সেই ঘরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো হারিয়ে যাওয়ার জন্য।

আরও পড়ুন

১৬ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত

বাঁশখালী উপজেলার ৪ নম্বর বাহারচড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আরিফ বিল্লাহ চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, এই ঘর আমার বাবা নিজের হাতে বানিয়েছিলেন। পরে আমি একটু একটু করে মেরামত করেছি। ঘরটা হয়তো খুব দামি ছিল না, কিন্তু আমাদের কাছে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় সম্পদ।

বাঁশখালীর এক বৃদ্ধা ছফুরা খাতুন জাগো নিউজকে বলেন, আমার স্বামীর রেখে যাওয়া কাঠের আলমারি, বিয়ের সময়ের খাট, পুরোনো কোরআন শরিফ, জমির কাগজ সব পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন মনে হচ্ছে, জীবনের ইতিহাসটাই হারিয়ে ফেলেছি।

বন্যাকবলিত এলাকার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্র চালু রাখা হয়েছে এবং দুর্গত মানুষের মধ্যে ত্রাণ, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানীয় পানি বিতরণ অব্যাহত রয়েছে- বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন 

একটি মাটির ঘরের সামনে বসে আছেন বৃদ্ধ আবদুল করিম। ভেঙে পড়া দেয়ালের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, এই বাড়িতে আমার বাবা জন্মেছেন, আমিও জন্মেছি। আমার সন্তানরাও বড় হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার বন্যার পানিতে সব শেষ।

jagonews24বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কাঁচা ঘর, ধসে পড়েছে দেয়াল ও বসতভিটার একাংশ

শুধু বসতঘর নয়, বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ধান, সবজিখেত, মাছের ঘের, গবাদিপশুর খাদ্য ও কৃষি সরঞ্জাম। ফলে ক্ষতি এখন শুধু বর্তমানের নয়, আগামী কয়েক মাসের জীবিকাও অনিশ্চয়তার মুখে।

আরও পড়ুন

বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসন-নেতাকর্মীদের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ত্রাণের অপেক্ষায় থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক পরিবার এখনো রান্না করতে পারছে না। রান্নাঘর পানিতে ডুবে থাকায় কেউ শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছেন, কেউ প্রতিবেশীর সহায়তায় বেঁচে আছেন।

গন্ডামারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফুল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, উপজেলার গ্রামীণ জনপদের অধিকাংশ নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস মাটির ঘরে। টানা বর্ষণ ও পানির চাপে এসব ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে। অসংখ্য পরিবারের বসতঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে।

গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে, তবে আগের তুলনায় এর তীব্রতা কম থাকবে- পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ সুমন সাহা

তিনি বলেন, বাঁশ ও টিনের তৈরি ঘরগুলোও পানিতে তলিয়ে রয়েছে। অনেকেই প্রয়োজনীয় মালামাল, আসবাবপত্র, ধান-চাল কিংবা গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি।

বাঁশখালীর স্থানীয় বাসিন্দা স্বেচ্ছাসেবী ডা. আসিফুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ত্রাণের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পুনর্বাসন। কারণ খাবার দিয়ে কয়েক দিন চললেও ভেঙে যাওয়া একটি ঘর আবার দাঁড় করানো অনেক পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। উপজেলার বড় একটি অংশ এখনো পানির নিচে। আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।

আরও পড়ুন

কেউ ছেড়েছেন ঘর, কেউ পানিবন্দি

তিনি জানান, দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে গিয়ে মানুষের চরম দুর্ভোগের চিত্র দেখা যাচ্ছে। অনেক পরিবার নিয়মিত খাবার জোগাড় করতে পারছে না, কেউ কেউ দিনে একবেলাও খাবার পাচ্ছে না। বন্যার পানিতে বহু মাটির ঘর ক্ষতিগ্রস্ত ও ধসে পড়েছে। সরেজমিনে পরিস্থিতি না দেখলে এসব মানুষের দুর্দশার প্রকৃত চিত্র উপলব্ধি করা কঠিন।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, বন্যাকবলিত এলাকার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্র চালু রাখা হয়েছে এবং দুর্গত মানুষের মধ্যে ত্রাণ, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানীয় পানি বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

jagonews24বন্যার আঘাতে ভেঙে পড়েছে মাটির ঘর, মুহূর্তেই শেষ বহু বছরের আশ্রয়

তিনি বলেন, যেসব এলাকায় এখনো পানি রয়েছে, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ত্রাণ পাঠানো হচ্ছে। পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ সুমন সাহা জাগো নিউজকে বলেন, গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে, তবে আগের তুলনায় এর তীব্রতা কম থাকবে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, চট্টগ্রাম জেলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এরই মধ্যে ৪৩ লাখ টাকা বিভিন্ন উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত বিতরণ করা হবে।

আরও পড়ুন

প্রতিমন্ত্রী অমিত / বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিতভাবে কাজ করছে সব বাহিনী

এছাড়া জেলার জন্য ৭০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪০০ মেট্রিক টন চাল এরই মধ্যে দুর্গত মানুষের মধ্যে বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৩০০ মেট্রিক টন চাল শনিবার বিভিন্ন উপজেলায় পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্টাফ অফিসার টু ডিসি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আসিফ জাহান সিকদার জাগো নিউজকে বলেন, বন্যার কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এখনো প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। দুর্গত মানুষের সহায়তায় জেলা প্রশাসনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ (কন্ট্রোল রুম) চালু রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ত্রাণ বিতরণ ও উদ্ধার কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দুর্গত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অল্প সময়ের অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের ঘটনা বাড়ছে। ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের নদী ও পাহাড়সংলগ্ন এলাকাগুলো আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই শুধু ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ব্যবস্থাপনা, টেকসই আবাসন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন

পানির নিচে রাঙ্গামাটির ফারুয়া, তীব্র স্রোতে ত্রাণ পৌঁছাতেও হিমশিম

বন্যার পানি একসময় নেমে যাবে। মানুষ আবার ঘর তুলবে, নতুন করে জীবন শুরু করবে। কিন্তু বাপ-দাদার হাতের তৈরি সেই পুরোনো ঘর, কাঠের সিন্দুক, শতবর্ষী গাছ কিংবা পরিবারের ইতিহাস বহন করা স্মৃতিগুলো আর কখনো ফিরে আসবে না। অনেকের কাছে এবারের বন্যার সবচেয়ে বড় ক্ষতি অর্থের নয়-স্মৃতির।

এমআরএএইচ/এমআইএইচএস