ভোরে বৃষ্টি না হওয়ায় সবাই ধারণা করছিলেন এবার পানি কমবে। কিন্তু দুপুর পার না হতেই ফের শুরু হয়েছে মুষলধারে বৃষ্টি। ফলে কমার পরিবর্তে প্লাবিত এলাকায় পানি আরও বাড়ছে। এতে দুর্ভোগ কমছে না কক্সবাজারবাসীর। ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে এখনো পানিবন্দি লাখো মানুষ।
পানিবন্দি এলাকাগুলোর কোথাও খাবার সংকট, কোথাও খাবার পানি সংকট দুর্বিষহ দিনপার করছেন দুর্গতরা। তবে, শনিবার (১১ জুলাই) সকাল থেকে নৌকায় করে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছেন জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা।
এদিকে, ঈদগাঁও ও রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নের সীমানা গ্রাম হাসনাকাটায় পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ভেসে আসা নিখোঁজ মাদরাসাছাত্র সাজেদের (১২) মরদেহ চারদিনের মাথায় উদ্ধার হয়েছে। শনিবার (১১ জুলাই) সকালে ফুলেশ্বরী নদীর ঈদগাঁওয়ের গজালিয়া অংশে ভাসমান অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
আরও পড়ুন
ঢলে ভেসে আসা লাকড়ি ধরতে গিয়ে নিখোঁজ সাজিদের মরদেহ উদ্ধার
ঈদগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল জাহান চৌধুরী জানান, সাজেদ ঈদগড় ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের হাসনাকাটা কুনারপাড়া এলাকার মো. নুরুল ইসলামের ছেলে। সে চরপাড়া নুরানি মাদরাসার শিক্ষার্থী ছিল। বুধবার (৮ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঈদগড়-ঈদগাঁও ফুলেশ্বরী খালে সে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হয়।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, ‘বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় সরকার এরইমধ্যে জেলায় ৩০ লাখ টাকা এবং সাড়ে ৪০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন টিম বন্যাদুর্গত দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষের কাছে ত্রাণসহ বিভিন্ন ধরনের জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে।’
দুপুরে বন্যাদুর্গত পেকুয়া ও চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণকালে জেলা প্রশাসক আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেই কক্সবাজারের খবরাখবর নিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
ডিসি বলেন, ‘আজ বৃষ্টিপাত অনেকটাই কমেছে। মাতামুহুরী নদীর পানিও উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে এসেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নদীর পানি এখন বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আশা করছি, আগামীকালের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে এবং ধীরে ধীরে পানি নেমে যাবে।’
আরও পড়ুন
আট দিন পর ট্রলারে সেন্টমার্টিনে ফিরলেন ১৪০ দ্বীপবাসী
এর আগে জেলা প্রশাসক পেকুয়া সদর ইউনিয়নের বাংলাপাড়া গ্রাম পরিদর্শন করে পানিবন্দি মানুষের মাঝে ত্রাণ, ওষুধ, মোমবাতি ও নিরাপদ পানি বিতরণ করেন। পরে তিনি চকরিয়ার পূর্ব বড়ভেওলার বেতুয়া বাজার স্টেশন ও কোনাখালী ইউনিয়নের মরংগুনা এলাকা পরিদর্শন করেন। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দি পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী, জরুরি ওষুধ, মোমবাতি ও নিরাপদ পানি বিতরণ করা হয়। এসময় পেকুয়া ও চকরিয়ার ইউএনও সঙে ছিলেন।
গত ৪ জুলাই রাত থেকে কক্সবাজারে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। ক্রমে ভারী বর্ষণের ফলে কক্সবাজার সদর, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়ায় খাল-বিলে পানি জমে যায়। পাহাড়ধসে মারা যায় রোহিঙ্গা ও স্থানীয়সহ অন্তত ২৫ জন। এরই মধ্যে পাহাড়ি ঢল এবং জলাবদ্ধতায় চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই পানি-ডুবে গেছে ঘরবাড়ি, ক্ষেত-খামার, মৎস্যঘের, ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে বন্যাকবলিত মানুষের।
কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের রামুর কাঠির মাথা, চাইল্যাতলীসহ আরো কয়েকটি এলাকায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক পানির নিচে। বন্ধ রয়েছে ছোট যান চলাচল। ডুবে গেছে আশপাশের গ্রামের পর গ্রাম।

পানিবন্দি মানুষ খাবারের সন্ধানে নৌকা ও ঠেলাগাড়িতে ছুটছেন। এখানেও খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি যে সহায়তা পৌঁছানো হচ্ছে তা অপ্রতুল।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘সপ্তাহ ধরে টানা বৃষ্টিপাতে উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা বন্যাকবলিত। দুই থেকে আড়াই হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি। তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। পানিবন্দিদের সেখানে সরিয়ে নিয়ে খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান বলেন, ‘বন্যায় জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। বিভিন্ন ঘটনায় মোট ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ত্রাণ হিসেবে ১০ লাখ টাকা, ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৪৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার উপজেলা পর্যায়ে বিতরণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন করে আরও ২০ লাখ টাকা ও ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা আগামী রবি বা সোমবার উত্তোলনের পর উপজেলা পর্যায়ে বিতরণ করা হবে।’
আরও পড়ুন
কক্সবাজারে বন্যা / মহাসড়কে কোমরসমান পানি, দুর্ভোগে ৫-৬ লাখ মানুষ
তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসন অতিরিক্ত এক হাজার প্যাকেট শুকনো খাবারের চাহিদা পাঠিয়েছে। তবে এ বরাদ্দ এখনো পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৫৫মিলিমিটার। কিন্তু ৬টার পর টানা অতিভারী বৃষ্টি হওয়ায় রাত ৯টার পর্যবেক্ষণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়বে।
সায়ীদ আলমগীর/এসআর








