ইসলামিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার নামে সম্প্রতি এক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। কয়েক বছর ধরে এ প্রতিষ্ঠানের নামে নিয়মিত সরকারি বরাদ্দ আসছে। তবে খোঁজ নিয়ে ওই এলাকায় বর্তমানে এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে ইসলামিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা নামে একটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও বর্তমানে সেটি বন্ধ রয়েছে। পাশেই বাকেরগঞ্জ হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু থাকলেও বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। একইভাবে মমতাজের নেছা মহিলা মাদ্রাসা ও এতিমখানার নামেও এক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানেরও কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শুধু এ দুটি প্রতিষ্ঠানই নয়, একইভাবে আরও ১৩টি প্রতিষ্ঠানের নামে ১৩ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে এসব প্রতিষ্ঠানেরও কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেখিয়ে সরকারি চাল আত্মসাৎ করা হয়েছে। এমন অভিযোগ উঠেছে বাকেরগঞ্জ উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের বিরুদ্ধে। জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের মাধ্যমে ২০২৫ সালের শেষের দিকে তৎকালীন ইউএনও রুমানা আফরোজের সুপারিশে উপজেলার ১৫টি এতিমখানার নামে ১৫ টন চাল বরাদ্দ দেন বরিশাল জেলা প্রশাসক, যার বাজারমূল্য প্রায় নয় লাখ টাকা। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজে-কলমে এসব গায়েবি প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেখিয়ে এতিমদের জন্য দেওয়া সরকারি সহায়তা আত্মসাৎ করা হয়েছে। উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তালিকা ধরে গত কয়েক দিন সরেজমিন অনুসন্ধান করে যুগান্তর। তালিকায় থাকা নাম অনুযায়ী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে খোঁজ নিয়েও কোনো এতিমখানার কার্যক্রম পাওয়া যায়নি। তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এলাকার পরিচিত কিছু প্রতিষ্ঠানের নামের অংশ পরিবর্তন করে নতুন নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানার সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এমন অনিয়মের কারণে প্রকৃত এতিম শিক্ষার্থীরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পৌর এলাকার মাদ্রাসা ফয়জুল করিম দারুল উলুম বহুমুখী মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বাকেরগঞ্জ শাখার নেতা মাওলানা কামাল উদ্দিন বলেন, ‘উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের বরাদ্দ তালিকায় যে নামগুলো দেখেছি, আমার জানামতে সেগুলোর একটি নামও সঠিক নয়। ওই নামে কোনো মাদ্রাসা বা এতিমখানা আছে বলে আমার জানা নেই।’ ভুয়া তালিকায় এতিমদের নামে বরাদ্দের ঘটনায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। বাকেরগঞ্জ হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো বরাদ্দ আসে না। অথচ পাশের অস্তিত্বহীন মোহাম্মাদিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার নামে বরাদ্দ আসে।’ একই প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক সদস্য ও পৌর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মো. মিরাজ উদ্দিন জুয়েল বলেন, ‘শুনেছিলাম আমাদের প্রতিষ্ঠানের নামে তিন টন চাল বরাদ্দ এসেছে। পরে অফিসে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি আমাদের নামে কোনো বরাদ্দ নেই।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, এসব তালিকার সঙ্গে সাবেক ইউএনও রুমানা আফরোজ ও পিআইও কামরুজ্জামান জড়িত। তাদের যোগসাজশে এতিমদের বরাদ্দ আত্মসাৎ করা হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বাকেরগঞ্জ শাখার সভাপতি ও বাকেরগঞ্জ আল কারিম মডেল মাদ্রাসার পরিচালক মো. নাছির উদ্দিন রোকন ডাকুয়া বলেন, ‘এতিমের হক আত্মসাৎ করা শুধু অপরাধ নয়, এটি পাপও। যারা এতিমদের বরাদ্দ আত্মসাৎ করেছেন, তাদের কঠোর বিচার হওয়া উচিত।’ এ বিষয়ে উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে এমন কোনো ঘটনা আছে কি না খোঁজ নিয়ে জানানো হবে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ পাল বলেন, ‘বরাদ্দের বিষয়টি আমি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে আদৌ বরাদ্দ হয়েছে কি না তা যাচাই করা হবে। তবে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ হয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’








