আবহাওয়ার পরিবর্তন শুধু শরীরেই নয়, মানুষের মন, শক্তি ও ঘুমের ওপরও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যাদের মুড-সংক্রান্ত মানসিক সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরো স্পষ্ট।

আবহাওয়া কি সত্যিই মন ভালো করে?

আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের মানসিক অবস্থার সম্পর্ক রয়েছে—এমনই তথ্য উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিনের বাইরের তাপমাত্রার ওঠানামা মানুষের মেজাজ, শক্তির মাত্রা এবং ঘুমের মানের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরিবেশগত বিভিন্ন উপাদান কীভাবে মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে চলমান গবেষণায় এটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

জার্নাল অব অ্যাফেকটিভ ডিসঅর্ডার্স-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন মানসিক অবস্থার সম্পর্ক রয়েছে। তাপমাত্রা মানুষের আবেগগত অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ প্রভাব সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে।

গবেষণার সহ-লেখক এবং বর্তমানে টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দেবাঙ্গন দে বলেন, “মানুষ তার পরিবেশেরই একটি অংশ। তাপমাত্রা ও আলোর মতো পরিবেশগত বিষয়গুলো আমাদের ওপর প্রভাব ফেলে। এই সম্পর্কগুলো বুঝতে পারলে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কেও আরো ভালোভাবে জানা সম্ভব।”

বর্ষা ও আর্দ্র আবহাওয়া

শুধু তাপমাত্রাই নয়, বর্ষাকালের উচ্চ আর্দ্রতা, টানা মেঘলা আবহাওয়া এবং সূর্যালোক কম পাওয়া মানুষের মেজাজ, শক্তির মাত্রা ও ঘুমের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত আর্দ্রতা মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে, ঘুম ঘুম ভাব ও ক্লান্তি বাড়াতে পারে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বিরক্তি বা উদ্বেগও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘায়িত বর্ষা, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন শুধু সংক্রামক রোগের ঝুঁকিই বাড়ায় না, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে উদ্বেগজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক সম্ভাবনা থাকে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, আবহাওয়া মানুষের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারলেও এটি একমাত্র কারণ নয়। ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, মানসিক রোগের ইতিহাস, জীবনযাপন, সামাজিক পরিস্থিতি এবং পরিবেশগত অন্যান্য উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এছাড়াও, গবেষণায় বসন্ত ও শরৎ—এই দুই ঋতুতেও মানুষের মনের এই পরিবর্তন হয় । বসন্তে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ভালো মেজাজ, বেশি শক্তি ও উন্নত ঘুমের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে অন্যদের ক্ষেত্রে এ ধারা সবসময় দেখা যায়নি।

শরৎকালে সম্পর্কটি ছিল একটু জটিল। ড. দেবাঙ্গন দে জানান, মৌসুমের গড় তাপমাত্রার চেয়ে বেশি বা কম—উভয় ধরনের তাপমাত্রাই বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ইতিবাচক মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। কেন এমন হয়, তা জানতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।

পরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক

তবে এই গবেষণা বলছে, আলো ছাড়াও তাপমাত্রা নিজেই মানসিক স্বাস্থ্যে স্বাধীনভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন তাপমাত্রার ওঠানামা বাড়ছে, তখন এই সম্পর্ক বোঝা জনস্বাস্থ্যের জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

গবেষণার প্রধান গবেষক এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের গবেষক ড. ক্যাথলিন মেরিকাঙ্গাস বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিদিনের তাপমাত্রার তারতম্য বেড়েই চলেছে। তাই পরিবেশগত পরিস্থিতি কীভাবে মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে, তা বোঝা এখন জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।”

ভবিষ্যতে পরিবেশ-সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল মানসিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে বলেও মনে করছেন গবেষকেরা। যেহেতু আবহাওয়ার পূর্বাভাস আগে থেকেই পাওয়া যায়, তাই ভবিষ্যতে চিকিৎসকেরা এসব তথ্য ব্যবহার করে মুড-সংক্রান্ত মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঝুঁকিপূর্ণ সময় আগেভাগেই শনাক্ত করতে পারবেন।

টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. দেবাঙ্গন দে বর্তমানে জনস্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. টাইলার প্রোকনোর সঙ্গে যৌথভাবে করা ‘স্পেসেস স্টাডি’ নামের আরেকটি গবেষণায় দেখা হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ ও বসবাসের পরিবেশ কীভাবে কিশোরদের শারীরিক কার্যকলাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে।

ড. দের মতে, “আমাদের লক্ষ্য হলো তাপমাত্রা, আলোর সংস্পর্শ, বায়ুদূষণ ও সবুজ পরিবেশের তথ্যকে ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা। পরিবেশগত তথ্যের সঙ্গে মানুষের আচরণ ও শারীরবৃত্তীয় তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে দৈনন্দিন পরিবেশ কীভাবে মানুষের সুস্থতায় প্রভাব ফেলে, তা আরো ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে।”

সূত্র: টেক্সাস এঅ্যান্ডএম, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক