ডিজিটাল নিরাপত্তার চাবিকাঠি ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড বা ‘ওটিপি’ এখন সাধারণ মানুষের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। গ্রাহকের সরলতাকে পুঁজি করে নিমিষেই অ্যাকাউন্ট শূন্য করে দিচ্ছে ডিজিটাল ডাকাতরা। তারা বিভিন্ন অজুহাতে যেমন: অ্যাকাউন্ট বা কার্ড ব্লক হওয়া, পুরস্কার জেতা বা সার্ভিস আপডেটের মতো বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে ওটিপি জানতে চায়। এছাড়া গ্রাহককে ক্ষতিকারক লিংকে ক্লিক করতে প্রলুব্ধ করে প্রতারণা করছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর অজান্তেই ডিভাইস থেকে ওটিপি চুরি হচ্ছে। এভাবে ওটিপি নেওয়ার পর হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে অসংখ্য মানুষের কোটি কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষ এখন সহজলভ্য ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে অনলাইন প্রতারকদের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে। বিশেষত আর্থিক লেনদেন ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টগুলোয় প্রবেশের জন্য অপরিহার্য ওটিপি চুরি একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন ফিশিং লিংক, ভুয়া কল বা টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও ওটিপি হাতিয়ে নিচ্ছে। এমন অপরাধের বিস্তার ঠেকাতে ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
সম্প্রতি নওশিন তাবাসসুম নামে এক গ্রাহকের ইসলামী ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে অত্যন্ত সুকৌশলে ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র। এ ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে সাইফুল চোকদার নামে এক প্রতারককে গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি।
জানা যায়, প্রতারকচক্রটির এক সদস্য তাকে ফোনে কল করে নিজেকে ইসলামী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা হিসাবে পরিচয় দেন। তিনি কৌশলে নওশিনের এটিএম কার্ডটি ব্লক হয়েছে জানিয়ে তা সচল করার নামে ওটিপি হাতিয়ে নেন। এরপর দ্রুত নওশিনের দুটি অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ডিজিটাল ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে কয়েক ধাপে ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন।
সিআইডির সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস টিম মামলাটির তদন্ত শুরু করে। ডিজিটাল প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়ার পর ফরিদপুরের ভাঙ্গার পল্লীবেড়া গ্রাম থেকে সাইফুল চোকদারকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাইফুল প্রতারণার সঙ্গে নিজের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। বৃহস্পতিবার ঢাকা সিএমএম আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিপিসির উপপরিদর্শক (এসআই) জিয়াউল হাসান বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে সাইফুল এই চক্রের আরও দুই সদস্যের জড়িত থাকার তথ্য দিয়েছেন। আমরা তাদের পরিচয় শনাক্ত করেছি এবং গ্রেফতারের জন্য কাজ করছি। চক্রটি একইভাবে আরও প্রতারণা করেছে। অন্যদের গ্রেফতার করলে বিস্তারিত জানা যাবে।
এদিকে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার-সিপিসিতে দেওয়া ভুক্তভোগীদের ১১ মাসের অভিযোগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আর্থিক প্রতারণা সংক্রান্ত ৩ হাজার ৪৬৫টি অভিযোগ রয়েছে। এর পরই রয়েছে হয়রানি সংক্রান্ত ১ হাজার ৯৮৭ অভিযোগ। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হ্যাকিং ৪৯১, জিম্মি ও হুমকি সংক্রান্ত ৪৩৮, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) প্রতারণা ও হ্যাকিং সংক্রান্ত ২২৮টি অভিযোগ রয়েছে। ক্লোন সংক্রান্ত ২১১টি অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফেসবুক ক্লোন ১৭৪টি। এছাড়া পর্নোগ্রাফির ৩৯টি অভিযোগ রয়েছে। অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত ৮৩টি, ব্যাংক হিসাব ও কার্ড সংক্রান্ত ৪২টি এবং অন্যান্য বিষয়ে রয়েছে ৪১৫টি অভিযোগ।
এদিকে ডিজিটাল প্রতারণা রোধে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আর্থিক প্রতারণার ঘটনা ক্রমাগত ঘটেই চলছে। সময়ের সঙ্গে কৌশলী হচ্ছে প্রতারকরা। এসব প্রতারণা মোকাবিলায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি সবচেয়ে জরুরি।







