মাসুদ রানা
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ও অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হলো পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি শক্তির কার্যকর ব্যবহার। বাংলাদেশ যখন অনবরত লোডশেডিং, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট এবং পরিবেশ দূষণের তীব্র ভারে জর্জরিত হয়ে একটি দূরদর্শী ও স্বনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে এগিয়ে যেতে চাইছে, তখন দেশের শক্তি সঞ্চয় (এনার্জি স্টোরেজ) ব্যবস্থার সনাতন ধারণার আমূল সংস্কারসাধন কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং একটি জাতীয় বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে, আমাদের গণপরিবহন, যোগাযোগ এবং ক্রমবর্ধমান শিল্প খাতে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা প্রথাগত, অদক্ষ প্রযুক্তি থেকে সরে এসে উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তির প্রসার নিশ্চিত করা এখন আমাদের অর্থনৈতিক অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আমাদের গ্রামীণ, উপশহর ও শহরতলীর যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের এক বিশাল অংশজুড়ে আজ প্রায় ৫০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার বা ইজিবাইক সচল রয়েছে। এই খাতটি দেশের তৃণমূল স্তরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাকা সচল রাখলেও, এর নেপথ্যে সচল থাকা শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থাটি মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ ও অদক্ষ। এই যানবাহনগুলোতে বহুল ব্যবহৃত প্রচলিত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির চার্জিং কার্যকারিতা মাত্র ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসেবে প্রতিদিন বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে চার্জ করার সময় বিপুল পরিমাণ শক্তি স্রেফ উত্তাপ ও পদ্ধতিগত অদক্ষতার কারণে অপচয় হয়ে যায়।
আরও পড়ুন
ঢাকা-চট্টগ্রাম ডুবে যায়, কারণ প্রাকৃতিক নাকি মানবসৃষ্ট
পরিসংখ্যানগত হিসাব অনুযায়ী, এই সনাতন সীসা-ভিত্তিক ব্যাটারি ব্যবহারের কারণে দৈনিক প্রতিটি যানবাহনে প্রায় ৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ নষ্ট হচ্ছে, যা জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় আড়াই কোটি কিলোওয়াট বা ২৫ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টার এক বিশাল বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি করছে। গ্রীষ্মকালে যখন দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদা এমনিতেই তীব্র আকার ধারণ করে, তখন এই পদ্ধতিগত ঘাটতি পুরো বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তোলে। এই বিশাল জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে রাষ্ট্রকে প্রতিবছর মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার খরচ করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিংবা ডিজেল আমদানি করতে হচ্ছে, যা আমাদের জাতীয় কোষাগার এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রতিমুহূর্তে এক অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।
প্রচলিত সীসা-ভিত্তিক প্রযুক্তির অদক্ষতা ও বর্জ্য যেখানে আমাদের জনস্বাস্থ্য, কৃষি এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে প্রতিদিন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, সেখানে আধুনিক লিথিয়াম-আয়রন ফসফেট প্রযুক্তির ৯২ থেকে ৯৮ শতাংশ উচ্চ চার্জিং কার্যকারিতা এবং ৯০ শতাংশেরও বেশি ব্যবহারযোগ্য ধারণক্ষমতা এই শক্তি অপচয়কে ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে সম্পূর্ণ সক্ষম। এই রূপান্তর কেবল আমাদের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডকে এক বিশাল বোঝা থেকে মুক্ত করবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতে কোটি কোটি ডলারের সাশ্রয় নিশ্চিত করবে।
অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের চেয়েও যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক ও গুরুতর, তা হলো জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যবহৃত প্রথাগত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির প্রায় ৮০ শতাংশই কোনো রূপ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ বা বৈজ্ঞানিক নিরাপত্তা বিধি ছাড়াই সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক ও অনিরাপদ উপায়ে লোকালয় সংলগ্ন এলাকায় পুনর্ব্যবহার বা রিসাইকেল করা হয়। এই আদিম ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়ার কারণে নির্গত ক্ষতিকর সীসা, এসিড ও ভারী ধাতুর বর্জ্য চারপাশের ফসলি জমি ও জলাশয়ে অবলীলায় মিশে যাচ্ছে। এই বিষাক্ত উপাদানগুলো পরবর্তীতে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে ক্যানসার, কিডনি বিকল হওয়া এবং শিশুদের মানসিক বিকাশ ও মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতিসহ নানা জটিল ও মরণব্যাধির জন্ম দিচ্ছে।
উপরন্তু, মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নদী-নালার জলজ বাস্তুতন্ত্রও আজ বিপন্ন। এর বিপরীতে, লিথিয়াম-আয়রন ফসফেট (এলএফপি) প্রযুক্তির ব্যাটারি ব্যবহারে সীসার মতো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব নেই এবং এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। যেখানে একটি সাধারণ লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির কার্যকর আয়ু বড়জোর এক বছর হয়ে থাকে, সেখানে একটি উচ্চমানের লিথিয়াম ব্যাটারি অনায়াসে ৮ থেকে ১০ বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে প্রায় ৬,০০০ চার্জ সাইকেল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এর অর্থ হলো, একই সময়কালে প্রথাগত ব্যাটারির তুলনায় লিথিয়াম ব্যাটারি প্রায় ১৫ গুণ কম শারীরিক বর্জ্য উৎপাদন করে, যা দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের মোট উৎপাদিত জ্বালানির অন্তত ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব উৎস থেকে আহরণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে পরিবেশ দূর্ষণকারী ও জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর যানবাহনগুলো বাতিল করে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহনে (ইভি) রূপান্তরের এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই সুদূরপ্রসারী জাতীয় লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেই আন্তর্জাতিক মানের টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তি উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
সাম্প্রতিক বাজেটে লিথিয়াম ব্যাটারির যন্ত্রাংশ ও উপাদান আমদানির ওপর শুল্ক হার ৬০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রগতিশীল সিদ্ধান্তটি স্থানীয়ভাবে শিল্পায়নের এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যদি আধুনিক অটোমেশন প্রযুক্তির সাহায্যে দেশীয় প্ল্যান্টে লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়, তবে তা শুধু দেশের ইভি খাত, কৃষি বা টেলিকম টাওয়ারের মতো সংবেদনশীল ব্যাকআপ খাতের জ্বালানি সংকটকেই শতভাগ সমাধান করবে না, বরং দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটাবে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই খাতে কারিগরি অনুকরণ এবং পর্যায়ক্রমে যৌথ-উদ্যোগী (জয়েন্ট ভেঞ্চার) পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন কারখানা স্থাপন সাধারণ নাগরিকদের জন্য ক্লিন এনার্জির খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনবে।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ৯ বন্যা
বৈশ্বিক বাজারে লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তির চাহিদা যেভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তাতে ২০৩০ সালের মধ্যে এই শিল্পের বাজার ৪৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে এবং সমান্তরালভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও বার্ষিক প্রায় ৭ থেকে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধিসহ ৪৩৫ মিলিয়ন ডলারে স্পর্শ করবে। সুতরাং, এই বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আমাদের এখনই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিতে হবে। অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে পারলে বাংলাদেশ সবুজ প্রযুক্তির কেবল একজন আমদানিকারক বা ভোক্তা দেশ থেকে একটি স্বনির্ভর আঞ্চলিক প্রস্তুতকারক দেশে রূপান্তরিত হতে পারবে। এর ফলে নেপাল, ভারত ও শ্রীলঙ্কাসহ পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোতে এই ব্যাটারি রপ্তানি করার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, যা বাংলাদেশকে এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
পরিশেষ বলা যায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, নিরাপদ, বাসযোগ্য ও সবুজ পৃথিবী উপহার দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সেই সাথে দেশের টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে হলে আমাদের সনাতন, ক্ষতিকর ও অদক্ষ ব্যবস্থার মোহ কাটিয়ে আধুনিকতার আলোয় প্রবেশ করতে হবে। সরকারের ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়ন, সহজ শর্তে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি এবং কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড প্রয়োগের মাধ্যমে লিথিয়াম প্রযুক্তির মতো উন্নত জ্বালানি ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি। এই সবুজ বিপ্লবের হাত ধরেই বাংলাদেশ তার পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথে এগিয়ে যাবে।
লেখক: জ্বালানি প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও টেকসই শিল্প উদ্যোক্তা, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ইকোজেন সলিউশন লিমিটেড
কেএসকে








