গ্যাস-সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চট্টগ্রামের বাসিন্দারা। রান্নার চুলা, শিল্পকারখানা, সিএনজি ফিলিং স্টেশন, হোটেল-রেস্তোরাঁ—সবখানেই দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। এর প্রভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্য। আজ বুধবার (৫ আগস্ট) সকালেও নগরজুড়ে গ্যাসের সংকট অব্যাহত ছিল।
চট্টগ্রাম শহরের সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সেলিম জানান, গত সোমবার (৩ আগস্ট) রাত ৮টায় তিনি সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট এলাকার মা ফাতেমা সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ান। প্রায় ১২ ঘণ্টা অপেক্ষার পর গতকল মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকাল ৮টায় তিনি গ্যাস নিতে সক্ষম হন।
চট্টগ্রাম নগরের রাহাত্তারপোল এলাকার বাসিন্দা মো. ছাদুর রশিদ বলেন, ‘গ্যাস-সংকটের কারণে অটোরিকশার ভাড়াও বেড়ে গেছে। রেলস্টেশন থেকে চকবাজার ডিসি রোড পর্যন্ত ১০০ টাকার ভাড়া ১৮০ টাকা দিতে হয়েছে।’
চকবাজারের মিয়ার বাপের বাড়ি এলাকার বাসিন্দা তাহমিনা আফরোজ বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে চুলায় খুব কম চাপের গ্যাস আসছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে একেবারেই গ্যাস ছিল না। বাধ্য হয়ে বাড়তি দাম দিয়ে হোটেল থেকে দুপুরের খাবার আনতে হয়েছে।’
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার (১ আগস্ট) চট্টগ্রামে ২১৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। রোববার তা কমে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। সর্বশেষ সোমবার (৩ আগস্ট) সরবরাহ আরও কমে দাঁড়ায় ১৯৪ মিলিয়ন ঘনফুটে। অথচ চট্টগ্রাম অঞ্চলে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।
গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় কেজিডিসিএলের আওতাধীন প্রায় ৬ লাখ ২ হাজার ৪০৬ গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়েছেন। এর মধ্যে গৃহস্থালি গ্রাহক প্রায় ৫ লাখ ৯৮ হাজার, শিল্প গ্রাহক ১ হাজার ১৯৯, বাণিজ্যিক গ্রাহক ২ হাজার ৯১১, সিএনজি স্টেশন ৭০টি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ৫টি, সার কারখানা ৪টি এবং ২০৯টি ক্যাপটিভ পাওয়ার ইউনিট রয়েছে।
গ্যাস-সংকটের পাশাপাশি লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, ‘যতটুকু গ্যাস বরাদ্দ পাচ্ছি, ততটুকুই বিতরণ করছি। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া গ্যাসের ব্যবহার কমানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।’ তিনি জানান, বুধবার গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে ইতিবাচক কোনো খবর আসতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর থেকেই চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ কমতে শুরু করে। ১ আগস্ট থেকে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
দেশে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করে এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল। বর্তমানে সামিটের টার্মিনাল দিয়েই সীমিত আকারে গ্যাস সরবরাহ সচল রাখা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির সক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন এবং সামিটের সক্ষমতা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে স্বাভাবিক সময়েও দুটি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হয় না।
ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো কার্যক্রমই বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ সময়ে গ্যাসের চাপের রিডিং যেখানে ২২০ থাকে, বর্তমানে তা ১৫০ থেকে ১৭০-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে প্রতিটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে।
চট্টগ্রাম অটোরিকশা-অটোটেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. হারুনুর রশিদ বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগরে প্রায় ১৩ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রায় ১ হাজার ২০০ প্রাইভেট সিএনজি এবং অতিরিক্ত আরও অনেক যানবাহন চলাচল করে। গ্যাস-সংকটের কারণে চালকরা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান প্রয়োজন।’
গ্যাসের স্বল্পচাপের প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতেও। সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘গ্যাস-সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।’
বিএসআরএম গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) তপন সেনগুপ্ত বলেন, ‘গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। তখন বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু ফার্নেস অয়েলের দাম গ্যাসের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়ছে।’








