নাকডাকা ভোরে ঘুমটা ভেঙে গেল।

ছুটির দিন। বেলা সাড়ে এগারোটা। আমার জন্য ‘নাকডাকা ভোর’ই।

ফোন করেছে সাহেদ, ‘১০ মিনিটের মধ্যে আশিক ভাইয়ের বাসায় আয়। ভাবি রেঁধে রেখেছেন। আপাও আসবে।’ বলেই লাইন কেটে দিল।

আজ আশিক ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত? ভাবি নাকি রেঁধেও রেখেছেন! আর আপা আসবে মানে! তার তো ডিসেম্বরে আসার কথা।

মাথাটা ঝিমঝিম করছে। ভাবলাম, গোসল করলে ঠিক হয়ে যাবে। বাথরুমে গিয়েই বুঝলাম, সকাল থেকে বিদ্যুৎ না থাকায় মোটর বন্ধ। পানি যা আছে, তা দিয়েই কোনোরকমে ‘কাজ সারলাম’। ভাবলাম, আমার শুধু ট্যাপে পানি নাই। অনেকের তো জানে পানি নাই। ঢের ভালো আছি।‌ থ্যাংকস টু ভাইয়া, মানে আমার বড়ভাই। তাঁর সঙ্গে একই বাসায় থাকি।

প্রায় বারোটা বাজে। ঘড়িতে, আমারও। রেডি হয়ে দ্রুত বের হয়েই বয়স্ক এক চাচার ব্যাটারিচালিত রিকশায় উঠে পড়ি। এ বয়সেও চাচার স্পিড মারাত্মক। একটা বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে এমন টার্ন নিয়েছিল, সিট থেকে প্রায় উড়েই যাচ্ছিলাম।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'দুই বিঘা জমি' অবলম্বনে দুই বিঘা Landসাবধানকে যখন সাবধান হতে হয়

আশিক ভাইয়ের বাসায় ঢুকেই দেখি ব্যাপক ক্যাওম্যাও। পুরাই যেন ‘ক্যাওরান বাজার’।

সাহেদকে বললাম, ‘ঘটনা কী? আশিক ভাই কই? জলদি খাবার দিতে বল। সকাল থেকে না খাওয়া।’

সাহেদ ভ্রু কুঁচকাল, ‘তোকে খাওয়ার জন্য কে ডেকেছে?’

সাহেদের কথায় আমি আকাশ থেকে পড়লাম, ‘তুই-ই তো ফোনে বললি, ভাবি রেঁধে রেখেছেন!’

‘ঘুমের ঘোরে কী না কী শুনেছিস।’ সাহেদের কণ্ঠে বিরক্তি, ‘ভাবি রেঁধে রাখেননি, বেঁধে রেখেছেন। আশিক ভাইকে।’

ড্রইংরুমে ঢুকতেই শুনি ভাবির চিৎকার, ‘অনেক সহ্য করেছি, আর না…।’

আমি বললাম, ‘শান্ত হন, ভাবি। আপা আসুক, সব ম্যানেজ‌ হয়ে যাবে।’

‘আপা আসবে মানে?’ ভাবি অবাক! ‘আপা তো ডিসেম্বরে আসবে।’

আমি সাহেদের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আমিও সেটাই জানতাম। কিন্তু আপনাদের গ্যাঞ্জাম, সরি, সমস্যা সমাধানের জন্য আপা আজই চট্টগ্রাম থেকে আসবে। তা–ই না, সাহেদ?’

সাহেদ দাঁত কিড়মিড় করে বলল, ‘রাতে কী খেয়ে ঘুমিয়েছিলি, বল তো?’

‘সারা রাত কারেন্ট নাই, ঘুমাতে পারলাম কই! ঘুমাতে ঘুমাতে ভোর।’

‘শোন, আপা না, বলেছি রাফাও আসবে।’

ইদানীং কি কানে কম শুনছি, নাকি সাহেদ প্র্যাঙ্ক করছে, বুঝলাম না।

আপা মানে ভাবির বড় বোন সাবিনা আপা। জাঁদরেল মহিলা। তাদের পরিবারে আপার কথাই অঘোষিত আইন। আর রাফা আমাদের বন্ধু। অর্থ+নৈতিক—দুই ধরনের সমস্যায়ই তাকে আমরা পাশে পাই। এই মুহূর্তে সে আমার ডান পাশে দাঁড়ানো। 

বললাম, ‘ঘটনা কী রে?’

ভাবির দিকে তাকিয়ে রাফা বলল, ‘এবারের মতো আশিক ভাইকে মাফ

করে দেন।’

‘অসম্ভব! সে কি‌ একবারও নিজের দোষ স্বীকার করেছে?’

আমি, সাহেদ ও রাফা একযোগে আশিক ভাইয়ের দিকে তাকালাম। বেচারার দুই হাত ওড়না দিয়ে বাঁধা। খুবই বিব্রত।

বললাম, ‘ভাবি, আপনাদের বিয়ের একজন সাক্ষী আমি। স্পষ্ট মনে আছে, আপনি বলেছিলেন, আশিক ভাইকে ভালোবাসা দিয়ে বেঁধে রাখবেন। এই তার নমুনা?’

আমার কথা শুনে আশিক ভাইয়ের চোখ ছলছল করে উঠল।

ভাবি কিছুটা নরম গলায় বললেন, ‘এত আবেগ আর নাই। বিয়ের ছয় মাস গন। হানিমুন পিরিয়ড‌ শেষ।’ এরপর আশিক ভাইয়ের দিকে ফিরে বললেন, ‘সে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কয়টা পূরণ করেছে?’ 

‘চেষ্টা তো করে যাচ্ছি...’

আমরা চমকে উঠলাম। এটা আশিক ভাইয়ের কণ্ঠ? তার তো আবৃত্তির গলা। কথা বললেই চারপাশ গমগম করে। এখন এমন মিনমিনে শোনাল কেন!

‘রাখো তোমার চেষ্টা! কত দিন ধরে বলছি, গ্যাসের সমস্যা। পাত্তাই দিচ্ছ না।’

‘ভাবি, আদা আর টক দই ট্রাই করেছিলেন?’ সাহেদ বলল।

‘চুপ ফাজিল!’ এবার স্বয়ং আশিক ভাই ধমক দিলেন, ‘পেটের না, বাসার গ্যাসের লাইনে সমস্যা।’

‘কত দিন ধরে বলেছি, সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করো। কানেই নিচ্ছ না। আর পানির লাইন যে প্রায় সময়ই নষ্ট থাকে…’

‘ওসব আগের ফ্ল্যাটমালিক নষ্ট করে রেখে গেছে।’ আশিক ভাই বলেন, ‘ঠিক করতে সময় লাগবে।’

‘পেয়েছ এক যুক্তি, কিছু বললেই আগের মালিকের দোষ।’

‘সময় তো দিতে হবে।’ আশিক ভাইয়ের কণ্ঠে গমগম ভাবটা ফিরে এসেছে, ‘মাত্র ছয় মাসে সব সমস্যার সমাধান করা কঠিন। তবে আমার আন্তরিকতার অভাব নেই।’

‘রাখো তোমার আন্তরিকতা। আন্তরিকতা দিয়ে সম্পর্ক চলে, সংসার না।’

‘সবই বুঝলাম। কিন্তু আপনি আশিক ভাইয়ের হাত বেঁধে রেখেছেন কেন?’ আমি জানতে চাইলাম।

‘আমাকে রান্নাঘরে সাহায্য করতে গিয়েছিল। তিনটা বাটি ভেঙেছে। সাবিনা আপা মিসর থেকে এনেছিল। আমার পছন্দের বা–টি–গু–লো…’ প্রায় কাঁদো

কাঁদো কণ্ঠে বলতে বলতে ভাবি অন্য ঘরে চলে যান।

আশিক ভাই আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘কাজ করতে গেলে ভুল তো হবেই। তবুও থেমে থাকা যাবে না। ঠিক কি না?’

‘জি, ঠিক।’ রাফা বলল, ‘কিন্তু ভাই, শুধু শুধু বিরোধী দল, মানে ভাবির সঙ্গে তর্ক করতে যান কেন?’

‘তর্ক মানে? এটা বাক্‌স্বাধীনতা।’

সাহেদ বলল, ‘স্বীয় স্ত্রীর যেকোনো কথার জবাব দেওয়াটাই তর্ক। আপনি আজই অনলাইন ঘেঁটে মিসরের এক ডজন বাটি কিনবেন।’

আমি বললাম, ‘আর প্লিজ, ছুটির দিনে রান্নাঘরে গিয়ে প্লেট-বাটি ভাঙবেন না। দূরে থাকলেও আমাদের ঘুমের অসুবিধা হয়।’

আশিক ভাই রাগান্বিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। বুঝলাম, হাত বাঁধা না থাকলে এতক্ষণে তিনি আমাদের লাঞ্চের বদলে কিল-ঘুষি খাওয়াতেন।

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’নাম চেঞ্জে কী আসে যায়সবজান্তা সমীপেষুরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'দুই বিঘা জমি' অবলম্বনে দুই বিঘা Landআপনি কতটা অফিসের?রোনালদোর বিয়েকট খেয়ে চট করে দেওয়া স্ট্যাটাসগুচ্ছনিষেধ মানেই নিমন্ত্রণ কিছু লেখেন ভাই!