বারাক ওবামা যুগের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কয়েক দশক ধরে ইরানের ওপর হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রলুব্ধ করে আসছেন। ওবামা প্রশাসনকেও হামলা চালাতে বলেছিলেন নেতানিয়াহু। কিন্তু ওবামা, জো বাইডেন, এমনকি জর্জ বুশও তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শুধু ট্রাম্পই একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি এ কাজটা করলেন।

সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথাটি একটি প্রশ্নকে সামনে আনে-ওই প্রেসিডেন্টরা কেন ইরানের ওপর সর্বাত্মক হামলা থেকে বিরত ছিলেন? প্রশ্নের জবাব এসেছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে নামা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছ থেকেই। মার্কিনিরা বিষয়টি ভালোই টের পাচ্ছেন।

কার্যত যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে এখন তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রয়েছে। আর সেটা ইরানের কোনো শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধ সরঞ্জামের কারণে নয়। এটা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির জন্য।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে পরিবারের কয়েক সদস্যসহ হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। তারা মিনাবে একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র ফেলে ১৬৮টি শিশুকেও হত্যা করে।

জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনা ও ইসরাইলে পালটা হামলা শুরু করে ইরান। বন্ধ করে দেয় হরমুজ। এ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২১ শতাংশ জ্বালানি পরিবহণ করা হয়। রাতারাতি বেড়ে যায় জ্বালানি তেলের দাম। অপরিশোধিত জ্বালানি প্রতি ব্যারেল ৬০ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধাক্কার মুখে পড়ে।

কিন্তু এতেই কি যুক্তরাষ্ট্রের টনক নড়েছে? প্রকৃত ঘটনা আরও অনেক গভীরে। দেশটি হরমুজ প্রণালি খুলতে যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে, সেটা একেবারেই তাদের নিজ স্বার্থে। অনেকে বলেন, ইরান যুদ্ধে ইসরাইলের স্বার্থে জড়িয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি এখন দেখতে পাচ্ছে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর তাদের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। ‘আমার তোমাদের নিরাপত্তা দেই’-মধ্যপ্রাচ্যে ঘাঁটি গেড়ে যুক্তরাষ্ট্র যে বয়ান তৈরি করেছিল, এরই মধ্যে ইরান যুদ্ধে তা শেষ হয়ে গেছে। ইরানের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে আরব দেশগুলোতে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ঘাঁটিই বাঁচাতে ব্যর্থ হয়েছে।

এখন হরমুজ গেলে সবই যাবে। ইরান বলছে, তাদের সঙ্গে যারা ভালো সম্পর্ক বজায় রাখবে, তাদের সুবিধা দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে তারা প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর সমুদ্রসেবা ফি আরোপ করেছে। গত সপ্তাহে চীনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, তারা বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোকে এ ফির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেবেন। এ ঘোষণায় অনেক দেশই চাইবে ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়াতে।

গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ দিয়ে উপসাগরীয় অনেক দেশের খাদ্যপথ্য সরবরাহ হয়। এটিই তাদের বাণিজ্যের একমাত্র পথ। আর বাণিজ্য ভালো হচ্ছে বলেই দোহা ও দুবাইতে আলো ঝলমল করছে। হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে গেলে ওই দেশগুলোকে বাধ্য হবে ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে। পাশাপাশি এসব দেশের ওপর ইরানের প্রভাব বাড়বে। আগে তারা যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে খুশি করতে তেহরানকে বুড়ো আঙুল দেখাত, তখন তা পারবে না। এতে ক্রমেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ফুরাবে।

হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করলে এর মধ্য দিয়ে কী যাচ্ছে, তা অনুমোদন করবে ইরান। অস্ত্র সরবরাহ, মাদকসহ বিভিন্ন বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি ইরানের হাতে চলে আসবে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করা অনেক সংগঠনকে অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে বলে অভিযোগ আছে।

সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি হবে এবং যেটি পুরো মার্কিন সাম্রাজ্যকে নাড়িয়ে দিতে পারে, সেটি হলো পেট্রোডলার। ইরান যখন উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করবে, তখন তারা পেট্রোডলার বাতিলের চেষ্টা করবে। এরই মধ্যে চীনের সঙ্গে তারা ইউয়ানে লেনদেন করছে। পরে অন্য দেশগুলোকেও তা-ই করতে বলবে। একে ডলারের মূল্য পড়ে যাবে। বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যম হিসাবে ডলার ব্যবহার হওয়ায় এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। এর মাধ্যমেই তারা পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। যখন কোনো দেশের ওপর ক্ষুব্ধ হয়, তখন সে দেশে ডলার ব্যাবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়।

এখন প্রশ্ন হলো, ইরান কি জাহাজ চলাচলের জন্য আবার হরমুজকে উন্মুক্ত করবে? তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় তাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা তারা হরমুজে টোল আরোপের মাধ্যমে উসুল করবে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে (তুলে নিয়ে আবার বহাল করেছে); বিদেশে জব্দ সম্পদ ফিরিয়ে দেবে। এ অবস্থায় একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হয়, যেখানে হরমুজে জাহাজ চলাচলের কথা রয়েছে।

তাহলে লড়াই কেন? যুক্তরাষ্ট্র অবাধে জাহাজ চলাচল করবে-এমনটা বললেও ইরানের দাবি, জাহাজ চলবে, কিন্তু সেটা ইরানের ব্যবস্থাপনায়। ইরান টোল নেবে না, কিন্তু সেবার ফি নেবে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, হরমুজ আন্তর্জাতিক জলসীমা। ইরান এটাকে তাদের নিজস্ব এলাকা বলে জানাচ্ছে। আর এসবের মধ্যেই হরমুজে আটকে আছেন ৬ হাজারের বেশি নাবিক। তাদের জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি খাদের কিনারে। বিনিয়োগ নেই; সরবরাহে সংকট।

ইসরাইলের হয়ে ইরানের ওপর মার্কিন হামলার আগে হরমুজে স্বাভাবিকভাবে জাহাজ চলাচল করেছে। এখন এই হরমুজ রক্ষায় রাত হলেই ইরানে বোমা ফেলছে যুক্তরাষ্ট্র। আলী খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল ইসরাইল, এখন তারা দৃশ্যপটে নেই; লড়ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সূত্র : এএফপি, এনডিটিভি, নিউ আরব নিউজ, আলজাজিরা