হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত অচল করে দেওয়ার পর এবার লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালিকেও নতুন চাপের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার ইঙ্গিত দিচ্ছে ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনের হুতি মিত্রদের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নৌচলাচল ব্যাহত করে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ আরও বাড়াতে চাইছে। কারণ এমন হলে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি পরিবহন পথই ঝুঁকির মুখে থাকবে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের বড় অংশই পরিবহন হয়। অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ ব্যবহার করে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির বরাতে জানা গেছে, ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন আনসারুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ সতর্ক করেছেন—সৌদি আরব যদি ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলেও তিনি দাবি করেন।

মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ফাওয়াজ গেরগেসের ভাষ্য মতে, ইরান ওয়াশিংটনকে দেখাতে চাইছে, তারা প্রয়োজনে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব কৌশলগত দুই জলপথই একসঙ্গে অচল করে দিতে সক্ষম। এতে দ্বিপক্ষীয় সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সংকটে রূপ নিতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, তাৎক্ষণিক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের চেয়ে ধীরে ধীরে সংঘাতের বিস্তার বা ‘মিশন ক্রিপ’-এর ঝুঁকিই এখন বেশি। উভয় পক্ষ সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে চাপ বাড়াতে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এই সংকট ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্যও করতে পারে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হুতিরা লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে। এর ফলে বহু আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করতে বাধ্য হয়, যা পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য হুতিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালায় এবং আন্তর্জাতিক নৌ-জোট গঠন করে।

কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, হরমুজের পর বাব আল-মান্দেব ইরানের হাতে থাকা আরেকটি ‘চূড়ান্ত কৌশলগত অস্ত্র’। তবে তেহরান তখনই এটি ব্যবহার করবে, যখন তারা মনে করবে সর্বাত্মক সংঘাত এড়ানো আর সম্ভব নয়।

এদিকে সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করছে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তবে তিনি মনে করেন, তেহরানের সরাসরি নির্দেশ ছাড়া হুতিরা বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করবে না। আর তারা যদি আন্তর্জাতিক নৌপথে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আরও কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হতে পারে।