ভারতে পালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্য প্রকাশের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) দলগুলোর শীর্ষ নেতারা অনেকটা অভিন্ন সুরে স্পষ্টভাবে বলেছেন, শেখ হাসিনা ১৪০০ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যার হুকুমদাতা, গণহত্যাকারী এবং ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। সুতরাং তিনি বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল পুনর্গঠন বা সাধারণ নাগরিক হিসাবে ফিরবেন না। বরং একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসাবে তার ফাঁসির রায় কার্যকর করার জন্যই তাকে আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। তবে ঘোষণা দিলেও শেখ হাসিনা আসলেই ফিরবেন কিনা তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। এক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে থাকা বন্দিবিনিময় চুক্তি কার্যকর করার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তারা।
অবশ্য কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার ফিরে আসার বিষয়টি তার নিজের ইচ্ছার ওপরে নির্ভর করে না। তিনি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায়ও ভারতে যাননি। গণ-অভ্যুত্থান পরিস্থিতিতে তার নিরাপত্তা সংকট তৈরি হওয়ার মুখে ভারতের ‘সবুজ সংকেতে’ তিনি দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। বর্তমানে তার বাংলাদেশি পাসপোর্টও বাতিল করা হয়েছে। এখন দেশে ফিরতে হলে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে তাকে ট্রাভেল পাশ নিতে হবে, যেটি সরকারের সিদ্ধান্ত ছাড়া সম্ভব নয়। ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে তার দেওয়া বক্তব্য প্রকৃত অর্থে তার সিদ্ধান্ত নাকি ‘স্টান্টবাজি’ এ নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। বলা হচ্ছে, হয় দেশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার জন্য, নয়তো মাঠের অবস্থা বোঝার জন্যই তিনি এসব কথা বলে থাকতে পারেন।
টেলিফোন রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। দেশে ফেরার পর তিনি এবং তার দল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। রয়টার্সের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। তবে তিনি বলেছেন, দুই বছর আগে দেশ ছেড়ে তারা ভারতে আশ্রয় নিলেও এখন স্বেচ্ছায় ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান। ৭৮ বছর বয়সি শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশে ফেরার পর তারা আমাকে গ্রেফতার করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে। তারপরও আমাকে যেতে হবে।’
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গণমাধ্যমকে বলেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিচার শেষে আদালতে ফাঁসির রায় হয়েছে। আরও অনেক হত্যা মামলায় আদালতে তার বিচার চলছে। এই বিচারের বিষয় উল্লেখ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘হাসিনার অপরাধের ব্যাপারে আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে উনি (শেখ হাসিনা) যে হত্যার মহাযজ্ঞ চালিয়েছেন, শিশু-কিশোরদেরও হত্যা করেছেন; সেই হত্যাযজ্ঞের বিচার নিশ্চিত হোক, সেটা জনগণ চায়। আদালতে বিচার চলছে। ফলে অপরাধের ব্যাপারে বিচার হবে এবং আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মতে, বাংলাদেশের বড় বড় রাজনৈতিক ট্র্যাজেডিগুলোর উৎপত্তি সেখান থেকেই। তাই শীর্ষ নেতৃত্বের বর্তমান রাজনৈতিক কৌশল বোঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের যেসব নেতাকর্মী কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না এবং শুধু নীতিগত কারণে দল করতেন, তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, শীর্ষ নেতৃত্ব নিজের পরিবার নিয়ে নিরাপদে চলে গেছেন এবং সাধারণ নেতাকর্মীদের জনগণের মুখোমুখি বা এক প্রকার ‘বিদ্বেষের পাত্র’ হিসাবে রেখে গেছেন। শীর্ষ নেতৃত্ব দেশে ফিরে আবার দল পুনর্গঠন করবেন-এমন আশা মাঠপর্যায়ের কর্মীরা এখন আর করছেন না। তারা মনে করেন, যদি সততা ও সাহস থাকত, তবে আইনি প্রক্রিয়া ও সাজা একা মোকাবিলা করার মানসিকতা থাকা উচিত ছিল।’
জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে সরকার কি করছে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। ভারতের সঙ্গে আমাদের বন্দিবিনিময় চুক্তি আছে। সেই চুক্তি মোতাবেক ভারত সাজাপ্রাপ্ত হাসিনাকে ফেরত দিতে বাধ্য। তিনি বলেন, রয়টার্সের সাক্ষাৎকারের খবর যদি সত্য হয়, তাহলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। আমাদের দাবি হলো-তিনি যদি দেশে আসেন তাহলে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসাবে সেটি আইনি প্রক্রিয়ায় কার্যকর করতে হবে। সরকারের কাছে আমাদের এই দাবি থাকবে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। শুক্রবার রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্যই দেশে ফিরবেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে রায় হয়ে গিয়েছে। এখন এই সরকারের উচিত যথাযথ কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় গণহত্যাকারীকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এটা তো শেখ হাসিনা ঠিক করবেন না, তিনি কীভাবে আসবেন। তিনি কাদেরকে নিয়ে আসবেন, সারেন্ডার (আত্মসমর্পণ) করবেন কি করবেন না, এটা ঠিক করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। বাংলাদেশ সরকার এটা নিয়ে কথা বলবে দিল্লির সঙ্গে। এখানে আর কোনো পক্ষ নেই। ফলে এটা সরকার ঠিক করবে, তাকে কখন আনবে, কীভাবে আনবে এবং কীভাবে বিচারের রায় কার্যকর করবে। সব প্রস্তুতি নিয়েই তাকে আনতে হবে।’
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তিনি যে প্রক্রিয়ায়ই দেশে আসুক, তার দণ্ড কার্যকর করতে হবে। ১৪০০ নিরস্ত্র মানুষের খুনের হুকুমদাতা তিনি। জনগণ তার সাজা কার্যকর দেখতে চায়। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় আসবেন, এটা বিশ্বাস করি না। সরকারের উচিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাকে দেশে ফেরত আনার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা।








