রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের কুমড়াকান্দি গ্রামের আব্দুল হকের ছেলে আলী হাসান সোহেল। পরিবারকে একটু সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে রাখতে বিদেশে ভালো বেতনে কোম্পানিতে চাকরির আশা ছিল তার। কিন্তু দালালের খপ্পরে পড়ে তিনি এখন রাশিয়ায় পাচার হয়েছেন। দালাল চক্র তাকে ইউক্রেন সীমান্তে সম্মুখযুদ্ধে পাঠিয়েছে। শুধু সোহেল নন, দেশের বিভিন্ন এলাকার ৩০ যুবক একইভাবে দালালের খপ্পরে পড়েছেন। কেউ জীবন হারিয়েছেন, কেউ চরম আতঙ্ক নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে দিন কাটাচ্ছেন। জানা যায়, এসব যুবককে অমানুষিক নির্যাতন করে মাত্র চার দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ইউক্রেন সীমান্তের সম্মুখযুদ্ধে। তাদের মধ্যে মাত্র ছয়জনের হদিস মিললেও অপর ২৪ জনের কোনো সন্ধান মিলছে না। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রেই তারা মারা গেছেন। ড্রোনের আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন সোহেলসহ সন্ধান পাওয়া ছয়জন। তারা প্রায় দেড় মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে যোগাযোগ করে করুণ অবস্থার কথা জানিয়েছেন। তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকার ও স্বজনদের কাছে সহায়তা চেয়েছেন।

সোহেলসহ আরও তিনটি পরিবার ১৯ মে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। তারা দালাল চক্রের উপযুক্ত শাস্তির দাবি করেন।

সোহেলের স্ত্রী আকলিমা খাতুন বলেন, প্রতারিত হয়ে রাশিয়া যাওয়ার পর প্রায় দেড় মাস পর হঠাৎ একদিন ভিডিও কল করলে দেখি আমার স্বামীর চেহারা আর আগের মতো নেই। চুল-দাড়ি বড়, হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা এবং কানে তুলো দেওয়া। একটি তাঁবু থেকে কান্না করছেন আর বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছেন।’ আকলিমা বলেন, ধারদেনা করে টাকা দালাল ইমরানের মাধ্যমে এজেন্সি জাবেল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনালকে দিয়েছি। নিজেরা এখন মানবেতর দিন কাটাচ্ছি। এনজিওর লোকজনসহ পাওনাদাররা বাড়িতে আসে। এভাবে কতদিন কীভাবে চলবে।’ এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

অভিযোগ থেকে জানা যায়, সোহেলসহ গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার উত্তরপাড়া ঘোষের চর গ্রামের পলাশ শেখ, দারুল কুরআন ফকিরবাড়ির রনি ও বলাকইর এলাকার সৌরভ মোল্লাসহ ৩০ জন রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ঢাকার মালিবাগ এলাকার জাবেল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (আরএল-২৫০৫) নামে একটি এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। চারজনের কাছ থেকে সাত লাখ টাকা করে নেয় দালাল। ৭ মে বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে তারা তাদের রাশিয়ায় পাঠায়।

মস্কো বিমানবন্দরে নামার পর ৩০ জনকে দুই দলে ভাগ করে হোটেলে নেওয়া হয়। পরে ড্রোন কারখানায় কাজ দেওয়ার কথা বলে তিন দিন পর সবাইকে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর চুলকাটা, পোশাক পরিধানসহ সেনাবাহিনীর যাবতীয় কার্যক্রম শেষে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে অস্ত্র (একে-৪৭) ধরিয়ে যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার পর তারা একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সোহেল জানান, বোমার স্পি­ন্টারের আঘাতে তার ডান হাত মারাত্মকভাবে জখম হয়েছে। এই অবস্থায় প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার দুর্গম পথ হেঁটে রাশিয়ার একটি ক্যাম্পে পৌঁছাই। সেখানে পাঁচজন সঙ্গীর খোঁজ পাই। তারা বিভিন্নভাবে গুরুতর জখম হয়েছেন। একজন মুমূর্ষু অবস্থায় আইসিইউতে রয়েছেন। বাকি ২৪ জনের কোনো খোঁজ পাইনি। যুদ্ধক্ষেত্রে চারপাশে শুধু লাশ আর লাশ যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা গেছে।’

হাসপাতালে আসার পর তারা ছয়জন একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে সেখানে পরিবারের সদস্যদের যুক্ত করেন এবং প্রায় দেড় মাস পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। পরিবারের কাছে মুঠোফোনে খুদেবার্তা ও ভয়েসের মাধ্যমে তারা জানান, তাদের ৩০ জনের প্রত্যেককে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ৩০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করে বিক্রি করা হয়েছে।

গোপালগঞ্জ পলাশ শেখের বাবা জামিল শেখ বলেন, বিষয়টি জানার পর জাবেল-ই-নূর এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। এজেন্সি কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং ফের না আসতে ভয়ভীতি দেখিয়েছে। এ বিষয়ে সোহেলসহ কয়েকজন ভিডিও কলে সরাসরি যুগান্তরকে জানান, রাশিয়ান ৬০ হাজার রুবল (বাংলাদেশি প্রায় ৯০ হাজার টাকা) বেতনে নির্মাণ কোম্পানিতে তাদের কাজ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাশিয়া বিমানবন্দরে নামার পরই সবাইকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এ বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস বলেন, সোহেলের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। সরকারিভাবে তাকে ফেরত আনার চেষ্টা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সোহেলের পরিবারকে সহযোগিতা করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।