ধারণা করতে পারিনি, অন্তত আমি বিশ্বাস করতে পারিনি, হুমায়ূন আহমেদ আকস্মিক চলে যাবেন। বেরসিক কর্কট রোগ বহু প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু কেন যেন ভাবছিলাম, তিনি হুমায়ূন আহমেদ, তার মনোবল, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ক্যানসার নির্মূল হাসপাতাল তাকে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু না, মাত্র ৬৪ বছর বয়সে তিনশতাধিক সৃষ্টিকর্ম উপহার দিয়ে তিনি চলে গেলেন!
১৯ জুলাই ২০১২— হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে বাংলাদেশ এক শোকসভায় পরিণত হয়েছিল। একজন লেখকের মৃত্যু কতোটা আলোড়ন তুলতে পারে, মানুষ কতো হতবিহ্বল হতে পারে তা দেখতে পেলাম সেদিন হুমায়ূন-ভক্তদের মধ্যে। শুধু কি ভক্ত, যারা হুমায়ূনের লেখাকে পাংক্তেয় মনে করতেন না, যারা হুমায়ূনের সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চাকে বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার মূল ধারার অংশ মনে করতেন না, তারাও স্তব্ধ হয়ে, শোক ও শ্রদ্ধায় মিলিত হলেন শহিদমিনারে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে তখন হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প নিয়ে এমফিল করছি। এক শুভাকাঙ্খী হুমায়ূন আহমেদ কর্কট রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর আমাকে বলেছিল, তার সঙ্গে দেখা করতে। তার ভাষ্যটা এমন ছিল, মারা যেতে পারেন তিনি, কাজেই দ্রুত দেখা করা উচিত। আমি সেই কথাটা মানিনি। সেই শুভানুধ্যায়ীকে ভর্ৎসনাও করেছিলাম। আমি পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম, এমফিল পেপারটা শেষ করে তার হাতে তুলে দেব। আমার বিশ্বাস ছিল তিনি খুশি হবেন। পরবর্তীকালে তার স্বজন ও সুজনদের কেউ কেউ আমাকে বলেছিল, আপনি তাকে নিয়ে গবেষণা করছেন জানলে তিনি খুব খুশি হতেন, অনুপ্রাণিত হতেন, কে জানে হয়তো তার আয়ুরেখা আরও বেড়ে যেত। নিজেকে তাই একটা আফসোসের কাঠগড়ায় প্রায়শই দাঁড় করাই আমি।
আমি সে সময়ে চাইলে বাংলাদেশের যে কোন সাহিত্যিক, লেখক, সেলিব্রেটির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাই। হুমায়ূন আহমেদের নিকটজনেরাও আমার পরিচিত ছিলেন। বললেই, তারা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিতেন। কিন্তু কেন যেন আমার স্থির বিশ্বাস ছিল, তিনি অতো দ্রুত কর্কট নামের হারামির কাছে পরাজিত হবেন না। হায়, অনেক বিশ্বাসের মতো আমার এ বিশ্বাসটিও ভুল প্রমাণিত হলো!
আজ বরং আমার আরেকটি বিশ্বাসের কথা বলি। যত দিন যাবে, বাংলাদেশে হুমায়ূন আহমেদ তত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন, তত জরুরি হয়ে উঠবেন। আজকের বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা আমার সবচেয়ে বেশি মনে হয়। বিশেষত এখন যখন মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে আমরা নানা প্রশ্ন তুলছি, তখন হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনাগুলো অবশ্যপাঠ্য বিবেচনা করি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আবেগ, চেতনা তার ৮টি উপন্যাসে যেমন উঠে এসেছে তেমনি, ‘জলিল সাহেবের পিটিশন‘, ‘ফেরা‘, ‘শীত’, ‘ঊনিশ একাত্তর’, ‘অসুখ’- এর মতো অসংখ্য ছোটগল্পেও উঠে এসেছে। তার মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসগুলো নিয়ে আজকের পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ আলোচনা, গবেষণা জরুরি বিবেচনা করি। ‘আগুনের পরশমণি’ উপন্যাসে ঢাকার ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা অভিযান, ‘শ্যামল ছায়া’ উপন্যাসে নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী ও মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা অভিযানের কথা উঠে এসেছে। ‘অনিল বাগচী’র একদিন উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধে ধর্মভিত্তিক প্রচারিত ন্যারেটিভকে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন। সনাতন ধর্মের মানুষদের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে তার এই উপন্যাসে নির্মমভাবে উঠে এসেছে। এভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, তার মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র একত্র পাঠ করলে মুক্তিযুদ্ধের একটা বিস্তৃত বয়ান আমরা পাবো।
এ প্রসঙ্গে তিনি তার সময়ের আরেকজন জনপ্রিয়তম লেখক ইমদাদুল হক মিলনকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “মিলন, আমার মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ‘শ্যামল ছায়া’ যখন লিখেছি, সে সময় একদল মুক্তিযোদ্ধা, যারা যুদ্ধ করছে, তাদের প্রচণ্ড ভালোবাসা দেশের জন্য এবং দেশের জন্য যে কোনো সময় তারা তাদের জীবন বিসর্জন দিতে তৈরি— তাদের সেই ডেডিকেশন, সেটাই আমি আনতে চেয়েছি। ‘সৌরভ’—এ আমি লিখেছি একদল মানুষের কথা, যারা যুদ্ধে যেতে পারেনি। একজন খোঁড়া লোক, সে কিন্তু ঘরে বসা— যুদ্ধে যেতে পারছে না। তারপরও তার সমস্ত মন, সমস্ত ইন্দ্রিয়, সমস্ত শরীর কিন্তু পড়ে আছে যুদ্ধের ময়দানে। সে মানসিকভাবে একজন যোদ্ধা। একদল যারা সরাসরি যোদ্ধা, আরেক দলও যোদ্ধা, যারা মানসিকভাবে যুদ্ধ করছে। ‘অনীল বাগচীর একদিন’-এ ধরার চেষ্টা করেছি হিন্দু সম্প্রদায়ের অবস্থাটা। ‘আগুনের পরশমণি’ উপন্যাসে বলার চেষ্টা করেছি ঢাকায় যখন গেরিলা অপারেশন শুরু হলো, ওই যে একদল ছেলে, যাদের মাথার ভেতরে চে গুয়েভারা; এদের কাছে দেশের চেয়েও হয়তো বড় হচ্ছে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা। দেখো আমরা কী করছি। দেশপ্রেম অবশ্যই আছে। কিন্তু ওই জিনিসটিও আছে। এটাই বলতে চেয়েছিলাম ‘আগুনের পরশমণি’তে। আর সব কিছু মিলে পরে লেখার চেষ্টা করলাম আমার ‘জোছনা ও জননীর গল্প’।’’
বলার অপেক্ষা রাখে না, হুমায়ূন আহমেদই আমাদের বাংলাদেশের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধকে সবচেয়ে বনার্ঢ্যভাবে, নানা দিক থেকে তুলে ধরেছেন। আজকের প্রজন্মের জন্য, হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস পাঠ অত্যন্ত জরুরি। নিদেনপক্ষে হুমায়ূন আহমেদের একটি ছোটগল্পই যথেষ্ট মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী নানা প্রশ্নের জবাব দিতে। এ এক পরম বেদনার কথা যে, মুক্তিযুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় আমরা যুদ্ধাপরাধিদের বিচারের বিষয়টি বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। হুমায়ূন আহমেদই বাংলাদেশের প্রথম লেখক যিনি এ বিষয়টির প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এই একটি ছোটগল্প দিয়ে। ‘‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠন হওয়ার অনেক আগেই ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’-এর মতো গল্প লিখেছেন হুমায়ূন। যে গল্পের মূল প্রত্যয়— ঘাতকদের বিচার একদিন না একদিন হবেই। কেবল পথ দেখানো নয়, এ যেনো অমোঘ ভবিষ্যতবাণী উচ্চারণ।’’
মনে রাখা দরকার যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে বাংলা সাহিত্যে প্রথম লেখাটি আমরা হুমায়ূন আহমেদের হাত দিয়েই পাই। ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ নামের গল্পে তিনি যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রশ্ন তুলে ধরেন। ছোটগল্পকার হিসেবে শুধু নয়, ইতিহাসের প্রতি, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার দায়বদ্ধতার পরিচয় আমরা পাই একটি মাত্র গল্প পাঠে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও যদি আমরা বিবেচনা করি, অবশ্যই হুমায়ূন আহমেদ আজও সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। সমকালের রাজনীতি সচেতন লেখক তিনি। আপাতভাবে তার রচিত ‘হিমু’ উপখ্যানমালা অনেকেই চটুল, হাল্কা কিছু মনে করেন। কিন্তু এই তরুণ বোহেমিয়ান হিমুর মাধ্যমে তিনি এ দেশের রাজনীতি এবং সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সুকৌশলে।
‘দরজার ওপাশে’ উপন্যাসে হিমু অবলীলায় বলে, ‘‘কিছু কিছু লোক মন্ত্রী কপাল নিয়ে জন্মায়। জিয়া, এরশাদ যেই থাকুক, এরা মন্ত্রী হবেই। জহিরের বাবা এরকম ভাগ্যবান একজন মানুষ।’’ এই উদ্ধৃতির মাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সময় সময় দল-পাল্টানোর বিষয়টি উঠে আসে। আমাদের মন্ত্রীদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণাও এ উপন্যাসের রফিকের মন্তব্যের মাধ্যমে ফুটে ওঠে, ‘‘তুই কোন মন্ত্রী চিনিস না, তাই না? চেনার অবশ্য কথা না। ভালো মানুষদের সঙ্গে মন্ত্রীর পরিচয় থাকে না। বদগুলির সঙ্গে থাকে।’’ সমকালের রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্রের দলিল হয়ে থাকবে হিমু সিরিজের একাধিক উপন্যাস।
হিমুর নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই। বৃষ্টি আর জোছনাবিলাসী এই বেকার যুবক স্বপ্ন দেখে। কিন্তু তার সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ যে কারো চেয়ে তীক্ষ্ম। ‘হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম’ উপন্যাসের হিমু অবলীলায় বলে, ‘‘আমার ধারণা নিম্নশ্রেণীর পশুপাখী মানুষের কথা বোঝে। অতি উচ্চ শ্রেণীর প্রাণী মানুষই শুধু একে অন্যের কথা বোঝে না। বেগম খালেদা জিয়া কী বলছেন তা শেখ হাসিনা বুঝতে পারছেন না। আবার শেখ হাসিনা কী বলছেন তা বেগম খালেদা জিয়া বুঝতে পারছেন না। আমরা দেশের মানুষ কী বলছি সেটা আবার তাঁরা বুঝতে পারছেন না। তাঁরা কী বলছেন তাও আমাদের কাছে পরিষ্কার না।’’ এই সংলাপ যেন মনে করিয়ে দেয়, লাল টেলিফোনের যোগাযোগহীনতার গল্প। আমাদের রাজনৈতিক দলসমূহের জনবিচ্ছিন্নতার এই চিত্র তো আজও পাল্টায়নি।
‘হলুদ হিমু কালো র্যাব’ উপন্যাসে হিমু র্যাবের কর্মকাণ্ড, বিচারবিহীন হত্যা নিয়ে কথা বলেছেন। সে সময় বহু কলামিস্ট, সাংবাদিক র্যাবকে নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের রসিক কলম হলুদ হিমুকে মুখোমুখি করে দেন কালো র্যাবের। হুমায়ূন আহমেদই পারেন ‘হলুদ হিমু কালো র্যাব’, ‘হিমু রিমান্ডে’ নামে উপন্যাস লিখতে। হিমুকে র্যাবের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিনাবিচারে মানুষ হত্যার প্রসঙ্গটি লেখক তুলে ধরেন নিখুঁত দক্ষতায়।
‘হলুদ হিমু কালো র্যাব’ উপন্যাসে র্যাবের মুখোমুখি হিমু— ‘‘আমি বেশ কায়দা করে ছড়া বললাম— আমার নাম হিমু। এখন আমি একটা ছড়া বলব। ছড়ার নাম ‘র্যাব’। ছেলে ঘুমালো পড়া জুড়ালো র্যাব এলো দেশে সন্ত্রাসীরা ধান খেয়েছ খাজনা দেব কীসে? ছড়াটার মানে কী? এটা হলো স্যার ননসেন্স রাইম। ননসেন্স রাইমের মানে হয় না। হামটি ডামটি সেট অন এ ওয়ালের কি কোনো মানে হয়? ঘামবাবু বললেন, ফাজলামি ধরনের কথা বলে র্যাবের হাত থেকে পার পাওয়া যায় না এটা জানো? আমি বললাম, জানি স্যার। উপরে আছেন রব আর নিচে আছেন র্যাব।’’
এ নেহাত রসিকতা নয়, সাধারণ কোন প্রহসন নয়, এ হলো রীতিমতো প্রাশাসনিক একটি সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করা। এই একই উপন্যাসে বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবারতন্ত্রের বিষয়টি তুলে ধরেন হুমায়ূন আহমেদ। ডেমোক্রেটিক ক্যাপসুলের আড়ালে আমাদের রাজনীতি যে অলিগার্কি পদ্ধতিতে চলছে হিমুর চোখেই তা ধরা পড়ে। এ উপন্যাসে দেখি হিমু খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে মন্তব্য করে, ‘‘দেশরত্ন শেখ হাসিনার পুত্র জয়ের আগমন। ইন্টারেস্টিং খবর তো বটেই। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান রাজনীতি করবেন, আর শেখ হাসিনা চুপ করে বসে থাকবেন তা হবে না। এবার হবে পুত্রে পুত্রে লড়াই। আমরা নিরীহ দেশবাসী মজা করে দেখব।’’
আমার জানা মতে, বাংলাদেশের সমকালের আর কোন লেখকই এভাবে দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। আপাত সরল হিমুর বয়ানের মধ্যে দিয়ে আমরা রাষ্ট্রীয় সংকটের নানা দিক খুঁজে পাই। এমন সাহসী, সৎ উচ্চারণ পাঠ করা আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক ও জরুরি।
স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের মুক্ত চেতনা, রাজনৈতিক দায় এবং সর্বোপরি মানবিক বিকাশের প্রশ্নে হুমায়ূন আহমেদ আজও ভীষণ রকমের জরুরি, প্রাসঙ্গিক।








