ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) প্রধান ফটকের জুলাই স্মৃতিচিহ্ন ও গ্রাফিতি সংরক্ষণ করে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ বিষয়ে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মতামত নিতে দুই দফা বৈঠক করেছে প্রক্টরিয়াল বডি। তবে প্রশাসনের এ উদ্যোগকে ঘিরে সংগঠনগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হকের আগমন উপলক্ষে ক্যাম্পাসে বৃক্ষরোপণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং জুলাই স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে প্রধান ফটকের বর্তমান গ্রাফিতি ও লেখাগুলো সংরক্ষণ করে একই আদলে একটি ডামি বা প্রতিরূপ স্থাপনের পরিকল্পনাও করা হয়েছে।

প্রশাসনের এ উদ্যোগ নিয়ে শাখা খেলাফত ছাত্র মজলিসের সভাপতি জুনায়েদ খান বলেন, “ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন ফটকে অঙ্কিত লেখাগুলো আমাদের ২৪'র জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে। আন্দোলনের স্মৃতিচিহ্ন বহনকারী লেখাগুলোর সঙ্গে আমাদের আবেগ জড়িয়ে আছে। এগুলো আগামী দিনগুলোতেও দৃশ্যমান থাকুক, এমনটাই আমরা প্রত্যাশা করি। যদি গেটে রং করতেই হয়, তাহলে পরে জুলাইয়ের লেখাগুলো আবারো একইরূপে লিখতে হবে। প্রশাসনের বিকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী মেইন গেটের আদলে স্টিলের একটি স্থায়ী ডিসপ্লেতে জুলাই স্মৃতি সংরক্ষণের সিদ্ধান্তকে আমরা সমর্থন করি। তবে তা অবশ্যই বাস্তবায়ন হতে হবে।”

শাখা ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি ইসমাইল রাহাত বলেন, “জুলাইকে ধারণ করা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতি সংরক্ষণ করা যায়—এমন দৃশ্যমান উদ্যোগ প্রশাসন নিতে পারে। বর্তমানে থাকা আবেগমাখা শব্দগুলো সংরক্ষণের জন্য স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছি। সেটি বাস্তবায়ন হলে এরপর সংস্কার করা যেতে পারে। জুলাইয়ের স্মৃতি রক্ষায় প্রশাসন যে উদ্যোগ নেবে, আমরা তাতে সম্মতি জানাব।”

শাখা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক এস এম সুইট বলেন, “আমাদের পরামর্শ ছিল, জুলাই মাসে যেন জুলাইয়ের স্মৃতি পরিবর্তনের কোনো কাজ না করা হয়। প্রশাসন আগে জুলাই শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ ও অন্যান্য উদ্যোগ বাস্তবায়ন করুক, এরপর প্রধান ফটক সংস্কারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।”

ছাত্র ইউনিয়ন, ইবি সংসদের সভাপতি নুর আলম বলেন, "আমরা প্রধান ফটক সংস্কারের পক্ষে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে থাকা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের লেখাগুলো মুছে প্রধান ফটকের লেখাগুলো সুন্দরভাবে ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।”

শাখা জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক ফুয়াদ হাসান বলেন, "জুলাই আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে যে গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে, তা কোনো একক ছাত্র সংগঠন আঁকেনি; সাধারণ শিক্ষার্থীরাই এঁকেছেন। তাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত উপেক্ষা করে শুধু ছাত্র সংগঠনের মতামতের ভিত্তিতে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন হবে না।”

শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুফ আলী বলেন, “শহীদদের রক্তস্নাত জুলাইয়ের স্মৃতিচিহ্ন ও দেয়ালচিত্র মুছে ফেলার পক্ষে আমরা কোনোভাবেই মত দিতে পারি না। জুলাই বিপ্লবের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও চেতনাকে নস্যাৎ করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র চলছে। জুলাইয়ের স্মৃতি মুছে ফেলার অপচেষ্টা তারই অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সমস্যা, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, সার্টিফিকেট উত্তোলনের ভোগান্তি, ইকসুসহ অসংখ্য সমস্যা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন এসবের চেয়ে জুলাইয়ের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে বেশি তৎপর—এটি হতাশাজনক।”

শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমি মিথুন বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সৌন্দর্যবর্ধনে প্রশাসনের উদ্যোগকে আমরা সমর্থন করি। তবে জুলাই স্মৃতিগুলো আলাদা করে বড় এলইডি স্ক্রিনে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সব স্লোগান ও লেখা মুছে ফেলতে হবে। এছাড়া জুলাই স্মৃতি গ্রন্থাগার নিয়মিত চালু রাখা এবং এর তদারকির জন্য জনবল নিয়োগ দিতে হবে।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, “শিক্ষামন্ত্রীর সফর উপলক্ষে ক্যাম্পাসে বৃক্ষরোপণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জুলাই স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই সংগ্রহশালা পুনরায় চালু, প্রধান ফটকের জুলাই গ্রাফিতি সংরক্ষণ এবং একই আদলে নতুন গেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য জুলাইয়ের স্মৃতিকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা। প্রশাসন জুলাই গ্রাফিতি সংরক্ষণেই কাজ করছে। এজন্য স্মৃতিফলক ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে। জুলাই নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।”