২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকেই নিজের জাদুকরী বাঁ-পা আর এক মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে পুরো ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করেছেন । ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো দেশমের ডাকে ফ্রান্স দলে সুযোগ পাওয়া বর্তমানের এই তারকা চাইলে আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া কিংবা ইংল্যান্ডের হয়েও খেলতে পারতেন।

বর্তমানে ফ্রান্স দলের ছন্দের নিয়ন্ত্রক ওলিসে হয়তো কখনোই ‘লে ব্লু’দের জার্সি গায়ে তুলতেন না। লন্ডনে জন্ম নেওয়া এই মিডফিল্ডারের বাবা নাইজেরিয়ান এবং মা ফরাসি-আলজেরীয় বংশোদ্ভূত। ফলে তার সামনে একাধিক জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ ছিল।

তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে পাঁচটি অ্যাসিস্ট করা ওলিসে জানান, ফ্রান্সের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত তিনি অনেক ছোটবেলাতেই নিয়েছিলেন। ‘আমার মা ফ্রান্সের। ছোটবেলায় আমি এখানে আসতাম। ফ্রান্সের সঙ্গে আমার একটি আলাদা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। এখানে থাকতে পেরে আমি গর্বিত।’

শৈশবে তিনি নিয়মিত ফ্রান্স দলের খেলা অনুসরণ করতেন। ‘... এই দলে অনেক মানসম্পন্ন খেলোয়াড় ছিলেন। তবে এই দুজনকে আমি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতাম।’

আর্সেনাল, চেলসি, ম্যানসিটি ও রিডিংয়ের একাডেমিতে বেড়ে ওঠা ওলিসে ইংল্যান্ডেই বড় হলেও সবসময় ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ইংল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-২১ দলের আগ্রহ থাকলেও তিনি ২০১৯ সালে ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৮ দলে যোগ দেন। পরে অনূর্ধ্ব-২১ এবং ২০২৪ সালের অলিম্পিক দলেও খেলেন।

ইংরেজিতে ফরাসির চেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা ওলিসে কখনোই নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন না। ‘আমি আশা করি, এটি বিশেষ কিছুর শুরু। ছোটবেলা থেকেই ফ্রান্সের হয়ে খেলা ছিল আমার স্বপ্ন।’

এই স্বপ্ন পূরণ হলেও হতাশ হতে হয়েছে বাকি তিনটি দেশ- নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া ও ইংল্যান্ডকে। ২০২১ সালেই নাইজেরিয়া আফ্রিকা কাপ বাছাইপর্বের জন্য ওলিসেকে রিজার্ভ তালিকায় রেখেছিল। দুই বছর পর, যখন তিনি এখনও ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-২০ দলের খেলোয়াড় এবং ক্লাবে দারুণ খেলছিলেন, তখন আলজেরিয়ার কোচ ও তাকে দলে টানার চেষ্টা করেন।

আলজেরিয়ার আন্তর্জাতিক ফুটবলার হিশেম ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইনস্টাগ্রামে লিখেছিলেন, ‘মাইকেল ওলিসে, আমরা তোমার অপেক্ষায় আছি।’ এই পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও অলিসের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি।

প্রিমিয়ার লিগে ১০ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট করে আলোচনায় থাকা ওলিসেকে দিদিয়ে দেশম ফ্রান্সের দলে নেননি। সেই সুযোগে ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ গ্যারেথ সাউথগেট তাকে পাওয়ার আশা করেছিলেন।

তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘তাকে ক্রীড়া নাগরিকত্ব পরিবর্তন করতে হতো এবং সেই প্রক্রিয়ায় সময় লাগত। তিনি অসাধারণ একজন খেলোয়াড়, কিন্তু ইউরোর আগে সেটা সম্ভব ছিল না।’

ইউরোর বদলে ওলিসে ফ্রান্সের হয়ে প্যারিস অলিম্পিকে খেলেন। থিয়েরি অঁরির অধীনে তিনি দুটি গোল ও পাঁচটি অ্যাসিস্ট করে দলকে রৌপ্যপদক জিততে সাহায্য করেন।

অঁরি তখন বলেছিলেন, ‘ফ্রান্সের হয়ে খেলার তার ইচ্ছা আমাকে শিহরিত করে। সে চাইলে ইংল্যান্ডের হয়ে ইউরো খেলতে পারত, কিন্তু সে ফ্রান্সের হয়ে অলিম্পিক খেলাকে বেছে নিয়েছে। আজকাল আমরা খেলোয়াড়দের জার্সির প্রতি ভালোবাসা নিয়ে অনেক কথা বলি। অলিসের স্বপ্নই ছিল ফ্রান্সের হয়ে খেলা। এজন্য আমি তাকে গভীর শ্রদ্ধা করি।’

অবশেষে ২০২৪ সালে দিদিয়ে দেশম জাতীয় দলে ডাক দেন ওলিসেকে। ফ্রান্স সেই লড়াইয়ে জয়ী হয়, আর এরপরের গল্পটা ইতিহাস। এখন ‘লে ব্লু’দের ১১ নম্বর জার্সিধারী অলিসে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা। তিনি ফ্রান্সকে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জেতানোর লড়াইয়ে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, তেমনি রয়েছেন বয়ালন ডি’অর জয়েরও অন্যতম দাবিদার।

আরআর/আইএইচএস/