শেষ বাঁশি বাজার পরও যেন ম্যাচটা শেষ হচ্ছিল না!

ব্রাজিলের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে জাপান। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখন অন্য এক ম্যাচের আলোচনা। বাস্তবের ব্রাজিল-জাপান নয়, বরং কল্পনার এক ফুটবলারের নাম ঘুরে বেড়াচ্ছে লাখো মানুষের মুখে—ওজোরা সুবাসা। ও যদি মাঠে থাকত...

কাল্পনিক এক চরিত্রকে ঘিরে এমন আফসোসের কারণও আছে। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত জাপানি কমিকস ‘ক্যাপ্টেন সুবাসা’ শুধু একটি কমিকস নয়; এটি জাপানি ফুটবলের স্বপ্ন দেখার গল্প। যে সময় জাপান বিশ্বকাপে খেলাই ছিল দুরূহ, সে সময় লেখক ইউইচি তাকাহাশি এমন এক কিশোরের জন্ম দিয়েছিলেন, যে বিশ্বাস করত একদিন ব্রাজিলকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতবে জাপান।

সেই কিশোরই ওজোরা সুবাসা। অসাধারণ ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস, দুর্দান্ত খেলার বুদ্ধিমত্তা আর হার না মানা মানসিকতায় সুবাসা হয়ে ওঠে কোটি তরুণের নায়ক। তার কাছে বল ছিল শুধু একটি ফুটবল নয়, আজীবনের বন্ধু। আর স্বপ্ন ছিল একটাই—ফুটবলের সাম্রাজ্য ব্রাজিলকে হারানো। সময়ের সঙ্গে সেই স্বপ্ন কাগজের পাতা ছাড়িয়ে বাস্তবেও ছড়িয়ে পড়ে।

ছোটবেলায় ‘ক্যাপ্টেন সুবাসা’ পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছেন লিওনেল মেসি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জিনেদিন জিদান, আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরোর মতো কিংবদন্তিরাও। জাপানেও এই কমিকস একটি প্রজন্মকে ফুটবলের প্রেমে ফেলেছে। যে দেশে একসময় বেসবলের জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া, সেই দেশেই ফুটবলকে ঘরের খেলায় পরিণত করতে বড় ভূমিকা রেখেছে ‘ক্যাপ্টেন সুবাসা’।

২০০৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কাছে ৪-১ গোলে হেরেছিল জাপান। ২০ বছর পর একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে। ফলাফল বদলায়নি, কিন্তু বদলে গেছে দুই দলের ব্যবধান। আর সেই কারণেই জাপানিদের মনে আবার ফিরে এসেছে সুবাসার নাম। মজার ব্যাপার, এই কথা শুধু সমর্থকেরাই বলেননি। ‘ক্যাপ্টেন সুবাসা’র স্রষ্টা ইউইচি তাকাহাশিও বলছেন একই কথা। জাপানের বহুল প্রচারিত দৈনিক আসাহি শিমবুনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সুবাসা থাকলে হয়তো জাপান জিতেই যেত। ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে আমার মনে হয়, জয়সূচক গোলটি সুবাসাই করত।’

ইউইচি তাকাহাশির কথার মধ্যেও ছিল বাস্তবতার স্বীকৃতি। তাকাহাশি বলেন, ‘ম্যাচটি লাইভ দেখেছি। সত্যিই কষ্ট পেয়েছি। ১-১ হওয়ার পর মনে হয়েছিল, এবার আসল লড়াই শুরু হবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ব্রাজিল তাদের অভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।’

এরপর ইউইচি তাকাহাশিও ফিরে যান ২০ বছর আগের স্মৃতিতে, ‘জার্মানি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে জাপানের ম্যাচটি আমি মাঠে বসে দেখেছিলাম। সেই দলের সঙ্গে আজকের জাপানের পার্থক্য বিশাল। আমরা অনেক এগিয়েছি। কিন্তু এই ম্যাচ আবার মনে করিয়ে দিল, নকআউটে জিততে হলে এখনো কিছু পথ পাড়ি দেওয়ার বাকি।’

১৯৮১ সালে যখন তিনি ‘ক্যাপ্টেন সুবাসা’ লেখা শুরু করেন, তখন জাপান বিশ্বকাপে ওঠার জন্যই লড়াই করত। আর ব্রাজিল ছিল ফুটবলের অজেয় সাম্রাজ্য। তখন তাকাহাশিও ভাবতে পারেননি, একদিন এই জাপানই ব্রাজিলের সঙ্গে সমানতালে লড়াই করবে। তাঁর ভাষায়, ‘তখন কখনো ভাবিনি, একদিন জাপান ব্রাজিলের সঙ্গে সমানে সমান লড়বে।’

তাকাহাশির চোখে এবারের হার তাই ব্যর্থতা নয়; বরং স্বপ্নের আরও এক ধাপ কাছে পৌঁছানোর গল্প। তিনি মনে করিয়ে দেন, জাপানের সহকারী কোচ হিরোশি নানামিও ‘ক্যাপ্টেন সুবাসা’ পড়ে বড় হওয়া প্রজন্মের একজন, ‘ওই প্রজন্মের কাছে ব্রাজিল ছিল ফুটবলের রাজত্ব। আজ তারা এমন একটি দল গড়ে তুলেছে, যাদের বিপক্ষে জাপানের জয় অবাক করার মতো কিছু হতো না। এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।’

শেষে তাকাহাশির কণ্ঠে ফিরে আসে সেই পুরোনো স্বপ্নেরই প্রতিধ্বনি, ‘আপনি যদি হাল না ছাড়েন, তাহলে স্বপ্ন কখনো মরে না। আমি আশা করি, চার বছর পর জাপান বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হবে।’

একসময় কাগজের পাতায় আঁকা হয়েছিল সেই স্বপ্ন। আজ বাস্তবের ফুটবলও যেন ধীরে ধীরে তার দিকেই এগোচ্ছে! তাকাহাশির বিশ্বাস অন্তত তেমনই।