বাজারে প্রতিযোগিতা নষ্ট করতে বৈষম্যমূলক মূল্য নির্ধারণ করে সামিট কমিউনিকেশনস। একই সেবার জন্য নিজেদের প্রতিষ্ঠানের কাছে এক রকম দাম, প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে ২৫ শতাংশ বেশি দাম নিয়েছে তারা। এতে একদিকে লঙ্ঘিত হয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ও প্রতিযোগিতা আইন। অপরদিকে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারায় সরকার। আইন ভঙ্গ ও রাজস্ব ফাঁকির কারসাজি অভিযোগের সত্যতা পেয়ে সামিটকে ৩ কোটি টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। তবে এক বছরেও সেই অর্থ পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। বরং জরিমানা মওকুফ ও পুনঃশুনানির আবেদন করে সময়ক্ষেপণের চেষ্টা চালায়। যদিও নানা দেনদরবার ও আবেদনের পরও অবস্থান বদলায়নি বিটিআরসি। ২৯ জুনের কমিশন সভায় পূর্ণ জরিমানা বহাল রেখে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে জরিমানার অর্থ পরিশোধের চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিটিআরসির উপপরিচালক মো. আব্দুস শাহীদ চৌধুরী বলেন, সামিট কমিউনিকেশনসের বিরুদ্ধে কমিশনের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট আইন ও লাইসেন্সের শর্ত পর্যালোচনা করেই নেওয়া হয়েছে। কোম্পানিটি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন এবং লাইসেন্সিং গাইডলাইনের একাধিক বিধান লঙ্ঘন করেছে। সুতরাং তাদের জরিমানা দিতেই হবে। প্রতিটি লাইসেন্সের শর্ত ও রাজস্ব কাঠামো আলাদা। তাই একই গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠান হলেও লাইসেন্সের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত নীতিমালা ও ট্যারিফ অনুসরণ করতে হবে। লাইসেন্সের শর্ত উপেক্ষা করে বৈষম্যমূলক মূল্য নির্ধারণ গ্রহণযোগ্য নয়।

সামিট কমিউনিকেশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ আল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিটিআরসি কর্তৃক আমাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক জরিমানা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত কোনো অফিশিয়াল চিঠি আমরা এখনো পাইনি। তবে জরিমানার সিদ্ধান্ত পুনঃনিরীক্ষার জন্য আবেদনের কথা স্বীকার করে বলেন, গত বছরের ৭ ডিসেম্বর আমরা আবেদনের শুনানিতে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছি যে, বিটিআরসি গৃহীত প্রশাসনিক জরিমানার সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমরা একমত নই।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিটিআরসির একটি পরিদর্শক দল সামিট কমিউনিকেশনসের ঢাকার প্রধান কার্যালয় এবং যশোরের বেনাপোলে অবস্থিত স্থলভিত্তিক কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন (টিসিএলএস) পরিদর্শন করে। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির ব্যান্ডউইথ মূল্য নির্ধারণ ও রাজস্ব ভাগাভাগিতে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পায়। তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, সামিট কমিউনিকেশনস নিজস্ব ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবল (আইটিসি) লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের নিজস্ব ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ মাত্র ৮ টাকায় বিক্রি করেছে। অথচ অন্যান্য আইআইজি প্রতিষ্ঠানের কাছে বাজার প্রতিযোগিতা নীতি ভঙ্গ করে একই ব্যান্ডউইথ বিক্রি করে ১৯৬ দশমিক ৬৫ টাকা। টেলিকম বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবমেরিন বা টেরিস্ট্রিয়াল কেবল অপারেটররা যদি নিজস্ব সিস্টেমে পানির দামে ব্যান্ডউইডথ দেয় আর বাইরের আইআইজিগুলোকে প্রায় ২৫ গুণ বাড়তি দামে কেনাকাটায় বাধ্য করে, তবে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বিনষ্ট হয়।

বিটিআরসির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিজস্ব প্রতিষ্ঠানকে অস্বাভাবিকভাবে কম দামে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করে সামিট প্রতিযোগিতায় বৈষম্যমূলক সুবিধা দিয়েছে। এর ফলে ব্যান্ডউইথের মূল্য কৃত্রিমভাবে কম দেখিয়ে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব কমানোর বা ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভার কার্যবিবরণী (মিনিটস) পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনুমোদনহীন ট্যারিফে (মূল্যে) সেবা প্রদান এবং ব্যান্ডউইথ বিক্রিতে বৈষম্যমূলক মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে সামিট কমিউনিকেশনস ‘প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২’, ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১’-এর ধারা ২৫(ঘ) ও ৫০(১) এবং আইটিসি লাইসেন্সিং গাইডলাইনের অনুচ্ছেদ ৮.২ লঙ্ঘন করেছে। এছাড়া একই টিআইএন ও বিআইএনের অধীনে আইটিসি ও আইআইজি লাইসেন্স পরিচালনা করলেও লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী পৃথকভাবে রাজস্বের হিসাব সংরক্ষণ করা হয়নি বলেও কমিশনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

এর আগে, বিটিআরসির পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশনের ২৯৪তম সভায় সামিট কমিউনিকেশনসকে ৩ কোটি টাকা প্রশাসনিক জরিমানা করা হয়। এ সংক্রান্ত চিঠি গত বছরের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটির কাছে পাঠানো হয়। পরে সামিট কমিউনিকেশনস জরিমানা প্রত্যাহার এবং পুনঃশুনানির আবেদন করলে কমিশনের ২৯৭তম সভায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য উপপরিচালক মেহফুজ বিন খালেদকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নিযুক্ত কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদন এবং শুনানিতে উপস্থাপিত সব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার পর বিটিআরসি সামিট কমিউনিকেশনসের আবেদন চূড়ান্তভাবে নাকচ করে।

একই সঙ্গে ৩ কোটি টাকার প্রশাসনিক জরিমানা বহাল রেখে আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে বিটিআরসির অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগে ওই অর্থ জমা দিতে প্রতিষ্ঠানটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিটিআরসির ইঅ্যান্ডআই ডিরেক্টরেট এবং অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগকে। বিটিআরসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আগামী সপ্তাহের মধ্যেই সামিট কমিউনিকেশনসকে জরিমানার অর্থ পরিশোধের জন্য চিঠি পাঠানো হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে এ বিষয়ে পুনরায় জরিমানা মওকুফের কোনো আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না।