আশির দশকের শুরুতে ইরাকের তৎকালীন শাসক সাদ্দাম হোসেন এমন একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন ইরাককে আন্তর্জাতিক সিনেমা নির্মাণের কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে। তার কল্পনায় ছিল, বাগদাদ একদিন হয়ে উঠবে মধ্যপ্রাচ্যের ‘হলিউড’, টাইগ্রিস নদীর তীরে গড়ে উঠবে নতুন এক ফিল্মি সাম্রাজ্য। এ স্বপ্নের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় প্রকল্প ছিল ‘ক্ল্যাশ অফ লয়্যালিটিস’ নামে একটি মহাকাব্যিক ঐতিহাসিক সিনেমা, যার মাধ্যমে ইরাকের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল।
* ইতিহাসের গল্প, রাজনীতির বার্তা
১৯৭৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সাদ্দাম হোসেন বুঝতে পেরেছিলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি নয়, সাংস্কৃতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। হলিউড যেভাবে আমেরিকার ভাবমূর্তি গঠনে ভূমিকা রেখেছে, তেমনি সিনেমাকে রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার শক্তিশালী মাধ্যম হিসাবে দেখতেন তিনি। ‘ক্ল্যাশ অফ লয়্যালিটিস’ নির্মিত হয়েছিল ১৯২০ সালের ইরাকি বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সেই আন্দোলনকে ইরাকের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। সিনেমার মূল কাহিনিতে দেখানো হয় ব্রিটিশ কর্মকর্তা জেরাল্ড লিচম্যানের হত্যাকাণ্ড এবং স্বাধীনতার জন্য ইরাকিদের সংগ্রাম। অনেক সমালোচক পরে সিনেমাটিকে ‘সাদ্দামের লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ বলে অভিহিত করেন। কারণ, এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক সিনেমা ছিল না; বরং ইরাকের রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের একটি প্রচেষ্টাও ছিল।
* অর্থের অভাব ছিল না
সত্তরের দশকের শেষভাগে তেলের দাম বৃদ্ধি ইরাককে বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি দিয়েছিল। ফলে সিনেমা নির্মাণে অর্থ ব্যয় নিয়ে কোনো সংকোচ ছিল না। প্রযোজক লতিফ জোরেফানির জানান, ইরাকি কর্মকর্তারা যখন সাদ্দামকে বলেছিলেন আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা বানাতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন, তখন তার উত্তর ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, ‘যা লাগে লাগুক।’ প্রায় ৩ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত সিনেমাটি সে সময়ের অন্যতম ব্যয়বহুল প্রজেক্টে পরিণত হয়। তুলনামূলকভাবে বলা যায়, একই সময় নির্মিত হলিউডের বিখ্যাত ‘রিটার্ন অফ দ্য জেডি’-এর বাজেটও প্রায় একই পর্যায়ের ছিল।
* তারপর শুরু হলো যুদ্ধ
সিনেমাটির শুটিং শুরু হয়েছিল বাগদাদের কাছাকাছি মরুভূমি এলাকায়। কিন্তু কাজ শুরুর কিছুদিন পরই ইরান কর্তৃক আক্রান্ত হয় ইরাক। শুরু হয় দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধ। হঠাৎ করেই সিনেমার ইউনিট নিজেদের আবিষ্কার করে এক যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবেশে। জোরেফানি পরে স্মরণ করেছিলেন, তার ইউনিটের প্রায় ১৪০ জন সদস্য যুদ্ধের মধ্যে কাজ করছিলেন। তারা কেউই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। কারণ তারা অভ্যস্ত ছিলেন লন্ডনের পাইনউড স্টুডিও কিংবা হলিউডের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কাজ করতে। কিন্তু এবার তাদের কাজ করতে হয়েছিল এমন এক দেশে, যেখানে সত্যিকারের বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটছিল।
* শুটিং সেট থেকে সেনাবাহিনীতে
যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি পড়ে সিনেমার শুটিংয়ে। স্থানীয় অনেক অভিনেতা ও কর্মীকে হঠাৎ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে ডেকে নেওয়া হয়। ফলে বেশ কিছু দৃশ্য পুনরায় ধারণ করতে হয়েছিল। এমনকি সিনেমায় ব্যবহারের জন্য যুক্তরাজ্য থেকে আনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অস্ত্রের আদলে তৈরি প্রপসও সমস্যার সৃষ্টি করে। তুরস্ক সীমান্তে সেগুলো আটকে দেওয়া হয়। সীমান্তরক্ষীরা বিশ্বাস করতে পারেননি যে, এগুলো কেবল সিনেমার জন্য ব্যবহৃত হবে। শেষ পর্যন্ত বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করে সেই সরঞ্জামগুলো বাগদাদে নিয়ে আসে প্রযোজনা সংস্থা।
* এক মাতাল অভিনেতা, পুরো প্রজেক্ট সংকটে
তবে যুদ্ধ নয়, সিনেমাটির সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছিলেন এর প্রধান অভিনেতা অলিভার রিড। বিতর্কিত আচরণ ও মদ্যপানের জন্য তিনি আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। এক রাতে বাগদাদের একটি বিলাসবহুল হোটেলের রেস্তোরাঁয় মাতাল অবস্থায় তিনি এমন এক কাণ্ড ঘটান, যা ইরাকি কর্তৃপক্ষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। ঘটনার পর কয়েকজন মন্ত্রী পর্যন্ত দাবি জানান, তাকে অবিলম্বে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হোক। কিন্তু গল্পের প্রধান তারকাকে সরিয়ে দিলে পুরো সিনেমার নতুন করে শুট করতে হতো। তাই প্রযোজক জোরেফানি শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দেন। তিনি বলেন, ‘এটা রক্ষা করতে আমাকে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করতে হয়েছিল।’
* যখন সিনেমা আর বাস্তবতা এক হয়ে যায়
সিনেমাটির একটি দৃশ্যে একটি ট্রেন বিস্ফোরণের ঘটনা দেখানো হয়েছিল। দৃশ্যটি ধারণ করা হয় ইরান সীমান্তের কাছাকাছি একটি পরিত্যক্ত রেলপথে। পরদিন ইরানি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে তাদের বিপ্লবী বাহিনী ইরাকের ভেতরে একটি সামরিক ট্রেন ধ্বংস করেছে। বাস্তবে সেটি ছিল সিনেমার দৃশ্য, কিন্তু যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে অনেকেই সেটিকে সত্য ঘটনা বলে বিশ্বাস করেছিলেন। এ ঘটনা যেন প্রতীক হয়ে ওঠে পুরো সিনেমাটির। কারণ ‘ক্ল্যাশ অফ লয়্যালিটিস’র নির্মাণ প্রক্রিয়ায় বাস্তব যুদ্ধ ও সিনেমার কল্পনা বারবার একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।
* স্বপ্নের সমাপ্তি
১৯৮৩ সালে মুক্তির পর সিনেমাটি মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রশংসা ও পুরস্কার অর্জন করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে বড় সাফল্য পায়নি। এরপর ১৯৯০ সালে কুয়েত দখলের ঘটনায় ইরাকের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে সাদ্দামের সিনেমা সাম্রাজ্য গড়ার পরিকল্পনাও ভেঙে পড়ে। যে প্রকল্পের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন হলিউড গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত একটি মাত্র সিনেমায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়।








