ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর প্রায় চার মাস পার হতে চলেছে। এ সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং ব্যাহত হয়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্য। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা।
বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার একটি সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি অনুযায়ী, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলছে। এ সময়ের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, দেশটির ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার রূপরেখা তৈরি করা হবে।
একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হলে বিশ্বজুড়ে সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক কষ্ট লাঘব হতে পারে। তবে এ যুদ্ধ সবার জন্য ক্ষতি বয়ে আনেনি। কিছু কোম্পানির জন্য এই সংঘাত উল্টো বিপুল মুনাফা অর্জনের বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
বিশ্ববাজারে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পরও বেশ কিছু খাতের ব্যবসা রাতারাতি ফুলেফেঁপে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান, তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বড় বড় বিনিয়োগ ব্যাংক। বৈশ্বিক সংকটের এ সময়ে এসব খাতের মুনাফা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দেখা যাক, এই সংঘাত থেকে প্রকৃতপক্ষে কারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে—
জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানসমূহ
নগদ ডলার বা আর্থিক মুনাফার দিক থেকে বিচার করলে এ যুদ্ধ থেকে জ্বালানি খাতের চেয়ে সরাসরি লাভবান আর কোনো খাত হয়নি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ প্রবাহিত হতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এ সংকীর্ণ জলপথটিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা ও ওঠানামা দেখা দেয়।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১২৬ ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি সইয়ের পর থেকে তেলের দাম কমে যুদ্ধ–পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে এসেছে এবং বর্তমানে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭২ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারের অস্থিরতা কাজে লাগিয়ে মোটা অঙ্কের ফি এবং শক্তিশালী ট্রেডিং রাজস্ব পকেটে পুরেছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ব্যাংকগুলো। দেশটির শীর্ষ ছয় বিনিয়োগ ব্যাংক চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই যৌথভাবে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে।
তেলের এই উচ্চ মূল্যের কারণে কিছু তেল উৎপাদনকারী কোম্পানির ঘরে দেদার অর্থ এসেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন আঞ্চলিক জ্বালানি বাজারের মধ্যে দামের যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছিল, তা থেকেও কোম্পানিগুলো বাড়তি সুবিধা পেয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩ হাজার ২৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। কোম্পানিটি হরমুজ প্রণালি এড়াতে লোহিত সাগরের দিকে থাকা তাদের ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনটি ব্যবহার করেছে। এর মাধ্যমে তারা প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে এবং উচ্চ মূল্যে সেই তেল বিক্রি করেছে।
ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামও (বিপি) প্রথম প্রান্তিকে ৩২০ কোটি ডলার মুনাফা করার তথ্য জানিয়েছে। এ আয় আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। এমনকি বাজার বিশ্লেষকদের ২৬৭ কোটি ডলার মুনাফা হওয়ার পূর্বাভাসকেও এটি ছাড়িয়ে গেছে।
এদিকে কাতারের রাস লাফান স্থাপনায় ইরানের হামলার পর শেল কোম্পানির যৌথ মালিকানাধীন ‘পার্ল জিটিএল’ (গ্যাস-টু-লিকুইডস) কারখানার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাসকে তরল জ্বালানিতে রূপান্তর করার এ কারখানার ‘ট্রেন-২’ প্রসেসিং ইউনিট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেলের অনুমান, এটি মেরামত করতে প্রায় এক বছর লাগবে। তবে এত বড় ধাক্কার পরও কোম্পানিটি তাদের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী রেখেছে। প্রথম প্রান্তিকে তারা ৬৯০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের একই প্রান্তিকে ছিল প্রায় ৫৬০ কোটি ডলার।
ফ্রান্সের জ্বালানি কোম্পানি টোটালএনার্জিস কাতার, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের বৈশ্বিক উৎপাদনের ১৫ শতাংশ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। এরপরও বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির সংশোধিত নিট আয় দাঁড়িয়েছে ৫৪০ কোটি ডলার। আগের বছর একই প্রান্তিকে তাদের আয় ছিল ৪২০ কোটি ডলার।

হরমুজ প্রণালি এড়াতে আরব আমিরাতের ‘ফুজাইরাহ টার্মিনাল’ দিয়ে তেল রপ্তানি সচল রেখেছিল কোম্পানিটি। ফলে দেশটিতে স্থলভাগের তেল উৎপাদন দৈনিক ২ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলে বজায় রাখতে পেরেছে তারা।
বাজারের চরম অস্থিরতার সময় গত এপ্রিল মাসে বড় বড় তেল কোম্পানিগুলোর নগদ অর্থের প্রবাহ বা ক্যাশ ফ্লো বিশ্লেষণ করে ‘রাইস্টাড এনার্জি’ নামের একটি স্বাধীন জ্বালানি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান। তারা যুদ্ধ–পূর্ববর্তী সময়ে প্রতি ব্যারেল ৬৫ ডলারের কম দামের সঙ্গে যুদ্ধকালীন প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার দামের তুলনামূলক রিটার্ন বা লাভ হিসাব করে দেখেছে। দেখা গেছে, বিশ্ববাজারে তেলের এই উচ্চ মূল্য থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে সৌদি আরামকো।
রাইস্টাড এনার্জির আপস্ট্রিম রিসার্চ বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট থমাস লাইলস আল-জাজিরাকে বলেন, ‘যদি এই উচ্চ মূল্য সারা বছর ধরে বজায় থাকে, তবে প্রতিটি তেল সংস্থাই শেষ পর্যন্ত বড় অঙ্কের মুনাফা ঘরে তুলতে পারবে। এখন আসল প্রশ্ন, এই বাড়তি নগদ অর্থের কত বড় অংশ তারা নিজেদের পকেটে ভরতে পারছে।’
শুধু বড় তেল কোম্পানিগুলোই লাভবান হচ্ছে, তা নয়
সাধারণত বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান যুদ্ধ নিয়ে দেখা দেওয়া সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন নিরাপদ উৎসের সন্ধান করছেন। ফলে ‘ভেঞ্চার গ্লোবাল’ ও ‘চেনিয়েরে এনার্জি’র মতো মার্কিন এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের মুনাফা পাওয়ার সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
এই আকস্মিক ও বিশাল মুনাফা খুব বেশি দিন স্থায়ী না–ও হতে পারে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে।লাইলস আল-জাজিরাকে আরও বলেন, ‘আমি বলব, মধ্যপ্রাচ্যে বা বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে যাদের খুব বেশি ব্যবসা বা বিনিয়োগ নেই, এমন অধিকাংশ কোম্পানিই এ পরিস্থিতি থেকে লাভবান হওয়ার অবস্থানে রয়েছে। এদের মধ্যে কিছু মার্কিন শেল অয়েল কোম্পানি, কানাডিয়ান অয়েল স্যান্ডস কোম্পানি, আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো, লাতিন আমেরিকার তেল উৎপাদক ও ভেঞ্চার গ্লোবালের মতো এলএনজি কোম্পানিগুলো থাকবে, যারা স্পট মার্কেটে বেশি বিক্রি করে। ফলে ভিন্ন ভিন্ন কারণে এখানে লাভবান হওয়ার মতো অনেক পক্ষ রয়েছে।’
তবে বাজার বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই আকস্মিক ও বিশাল মুনাফা খুব বেশি দিন স্থায়ী না–ও হতে পারে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানির উচ্চ মূল্য বজায় থাকলে বাজারে তেলের চাহিদাও কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সামরিক সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানেরা হোয়াইট হাউসে এক জরুরি বৈঠকে বসেন। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রের মজুত কমে আসায়, তারা অস্ত্র উৎপাদন এক ধাক্কায় অনেক বাড়িয়ে দিতে সম্মত হন।
ওই বৈঠকে আরটিএক্স, লকহিড মার্টিন, বোয়িং, নর্থরপ গ্রুম্যান, বিএই সিস্টেমস, এলথ্রিহ্যারিস ও হানিওয়েলের মতো বড় বড় কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। এই কোম্পানিগুলোর প্রত্যেকের হাতেই এখন শত শত কোটি ডলারের অস্ত্রের ক্রয়াদেশ জমা হয়ে আছে।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের নিজেদের অস্ত্রের মজুত বাড়াতে হন্যে হয়ে ছুটছে। ফলে অস্ত্র নির্মাতাদের এ কাজের চাপ বা ক্রয়াদেশের তালিকা আগামীতে আরও দীর্ঘ হবে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের অনুরোধে প্রতিরক্ষা খাতে ৫০০ বিলিয়ন (৫০ হাজার কোটি) ডলারের বাড়তি বাজেট অনুমোদন করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর গত ১৯ মার্চ কংগ্রেসে আরও ২০০ বিলিয়ন (২০ হাজার কোটি) ডলারের অতিরিক্ত তহবিলের দাবি জানান হেগসেথ। সাংবাদিকদের কাছে এই দাবির পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ‘দুষ্ট লোকদের খতম করতে পয়সা লাগে।’
শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরাও ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছেন, এই অস্ত্রের বাজার দীর্ঘদিন চড়া থাকবে। ফলে তাঁরা এসব কোম্পানিতে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ শুরু করেছেন। সবচেয়ে ভালো পারফর্ম করেছে বোয়িং, আরটিএক্স, এলথ্রিহ্যারিস ও নর্থরপ গ্রুম্যান। কোম্পানিগুলোর আয় যেমন ব্যাপক বেড়েছে, তেমনি তারা পুরো বছরের আয়ের লক্ষ্যমাত্রাও বৃদ্ধি করেছে।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বোয়িংয়ের আয় ১৪ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ২২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। কারণ, এ সময়ে তারা আগের চেয়ে বেশি উড়োজাহাজ সরবরাহ করতে পেরেছে। কোম্পানিটি এখনো পুরোপুরি লাভের মুখ না দেখলেও তাদের লোকসানের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে এনেছে। আগের বছরের একই সময়ে যেখানে তাদের লোকসান ছিল ৩১ মিলিয়ন (৩ কোটি ১০ লাখ) ডলার, এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ মিলিয়ন (৭০ লাখ) ডলারে। অন্যদিকে কিছু গোপন সামরিক প্রকল্প এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান–সংক্রান্ত কাজের সুবাদে নর্থরপ গ্রুম্যান কোম্পানির জমা থাকা ক্রয়াদেশের পরিমাণ রেকর্ড ৯ হাজার ৫৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ যুদ্ধ অস্ত্র নির্মাতাদের জন্য আগে থেকেই চলে আসা একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসাকে আরও শক্তিশালী করছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চুক্তিগুলোই এ অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের প্রধান উৎস।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানেরা হোয়াইট হাউসে এক জরুরি বৈঠকে বসেন। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রের মজুত কমে আসায় তারা অস্ত্র উৎপাদন এক ধাক্কায় অনেক বাড়িয়ে দিতে সম্মত হন।
গত বছর প্রকাশিত ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট’ এবং ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন স্কুলের ‘কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্ট’-এর যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বেসরকারি অস্ত্র কোম্পানিগুলো পেন্টাগনের কাছ থেকে ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন (২ লাখ ৪০ হাজার কোটি) ডলারের চুক্তি পেয়েছে। এই বিশাল চুক্তির এক-তৃতীয়াংশই (৭৭১ বিলিয়ন বা ৭৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার) গেছে মাত্র পাঁচটি কোম্পানির পকেটে। এগুলো হলো লকহিড মার্টিন, আরটিএক্স, বোয়িং, জেনারেল ডায়নামিক্স ও নর্থরপ গ্রুম্যান।
পণ্য পরিবহন ও বিমা কোম্পানি
ইউরোপীয় আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার চেউভরেক্স’-এর তথ্যানুযায়ী, এ সংঘাতের কারণে জাহাজের যাতায়াতের সময় অনেক বেড়ে গেছে। এ ছাড়া জাহাজ চলাচলে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় বিশ্বের মোট তেলবাহী ট্যাংকার বহরের প্রায় ৭ শতাংশ কার্যত চলাচল থেকে বাদ পড়েছে। ফলে পণ্য পরিবহনের খরচ বা ভাড়া ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে সংকটের গভীরতা মাপা যায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব এশিয়াগামী প্রধান নৌপথের ভাড়ার দিকে তাকালে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যেখানে এই রুটের ভাড়া ছিল ১০০ ‘ওয়ার্ল্ডস্কেল’ পয়েন্ট, যুদ্ধের পর তা লাফিয়ে ৫০০ পয়েন্ট ছাড়িয়ে গেছে। ‘ওয়ার্ল্ডস্কেল’ হলো তেলবাহী ট্যাংকারের ভাড়া নির্ধারণের একটি আন্তর্জাতিক সূচক বা ইনডেক্স। এ সূচকে ১০০ পয়েন্ট বলতে যেকোনো নির্দিষ্ট নৌপথের একটি আদর্শ বা সাধারণ ভাড়াকে বোঝায়। এই হিসাব অনুযায়ী, ২ লাখ ৬০ হাজার টন তেল বহনে সক্ষম একটি বিশাল আকৃতির ট্যাংকারের ক্ষেত্রে প্রতিবার যাতায়াতে অতিরিক্ত কয়েক মিলিয়ন বা শত কোটি টাকা খরচ হচ্ছে।
ভাড়া বাড়ার কারণে সরাসরি লাভবান হয়েছে ফ্রন্টলাইন ও ডিএইচটি হোল্ডিংসের মতো বিশেষায়িত তেলবাহী ট্যাংকার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম তেলবাহী ট্যাংকার কোম্পানি ‘ফ্রন্টলাইন’ চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৫৩ কোটি ৬০ লাখ (৫৩৬ মিলিয়ন) ডলারের বেশি আয় করেছে। অন্যদিকে ‘ডিএইচটি’ তাদের কিছু জাহাজের জন্য দৈনিক ১ লাখ ডলারের বেশি ভাড়ার চুক্তি নিশ্চিত করতে পেরেছে।
ইরান যুদ্ধ বিমা কোম্পানিগুলোর জন্যও বিপুল মুনাফা বয়ে এনেছে। যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ‘যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বিমা’র খরচ এক ধাক্কায় পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। আগে যেখানে একটি জাহাজের মোট মূল্যের মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ বিমা খরচ হিসেবে দিতে হতো, তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৫ শতাংশে। কিছু ক্ষেত্রে এ খরচ জাহাজের মূল্যের ১০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। গার্ড, স্কাল্ড ও নর্থস্ট্যান্ডার্ডের মতো শীর্ষস্থানীয় বিমা কোম্পানিগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলে যাতায়াতকারী জাহাজের প্রিমিয়াম সাধারণ হারের (শূন্য দশমিক ১৫ থেকে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ) তুলনায় বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত করেছে।
সহজ কথায়, একটি ১০০ মিলিয়ন (১০ কোটি) ডলার মূল্যের তেলের ট্যাংকার যদি উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে মাত্র একবারও যাতায়াত করে, তবে শুধু বিমা করার জন্যই তার খরচ হচ্ছে প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন (১৫ লাখ) ডলার।
যুদ্ধকবলিত এলাকায় চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য এই ‘যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বিমা’ করা বাধ্যতামূলক। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ামাত্রই বিমা কোম্পানিগুলো দ্রুত তাদের পলিসির দাম বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে এই বিশেষ বিমার চাহিদা চড়া থাকবে। কারণ, জাহাজ ও পণ্যের মালিকেরা এ অঞ্চলে ব্যবসা করার ঝুঁকিগুলো নতুন করে মূল্যায়ন করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্দান কলোরাডোর মনফোর্ট কলেজ অব বিজনেসের ফিন্যান্সের অধ্যাপক কনস্ট্যান্টিন গুরদগিভ বলেন, বিমা কোম্পানিগুলো এখন তিনটি ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি। প্রথমত, দ্রুত পলিসির দাম বাড়িয়ে সব ঝুঁকি গ্রাহকদের ঘাড়ে চাপানোর সুযোগ; দ্বিতীয়ত, যুদ্ধক্ষেত্রে ইতিমধ্যে আটকে থাকা বিমাকৃত জাহাজগুলোর কারণে সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি এবং তৃতীয়ত, দীর্ঘ মেয়াদে এ অঞ্চলের নিরাপত্তাঝুঁকি বৃদ্ধি—যার কারণে যুদ্ধ থামলেও বিমার চাহিদা চড়া থাকবে। কনস্ট্যান্টিন গুরদগিভ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘যত দিন সাধারণ বেসামরিক জাহাজগুলোর বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হচ্ছে, তত দিন প্রথম ও তৃতীয় পরিস্থিতির কারণে যুদ্ধকালীন বিমা কোম্পানিগুলোর স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি মুনাফা শুধু বাড়তেই থাকবে। তবে এ সংঘাত যদি আরও তীব্র হয় এবং বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা বাড়তে থাকে, সে ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পরিস্থিতির কারণে বিমা কোম্পানিগুলোকে বিশাল লোকসানের মুখে পড়তে হতে পারে।’
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি টিকবে না বলে মনে করেন বেশির ভাগ মার্কিনওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলো
ইরানের সংঘাত থেকে বাদ যায়নি যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার বা ‘ওয়াল স্ট্রিট’। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল, মুদ্রা ও বন্ডের বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা তৈরি হয়েছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তাঁদের বিনিয়োগের জায়গা পরিবর্তন করতে শুরু করেন। ফলে পুঁজিবাজারে লেনদেন অনেক বেড়ে যায়। আর বাজারের এ অস্থিরতা কাজে লাগিয়ে মোটা অঙ্কের ফি এবং শক্তিশালী ট্রেডিং রাজস্ব পকেটে পুরেছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ব্যাংকগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ছয়টি বিনিয়োগ ব্যাংক—জেপি মরগান চেজ, ব্যাংক অব আমেরিকা, সিটিগ্রুপ, মরগান স্ট্যানলি, গোল্ডম্যান স্যাকস ও ওয়েলস ফার্গো চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই (প্রথম প্রান্তিক) যৌথভাবে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি (৪৮ বিলিয়ন) ডলার মুনাফা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ব্যাংক ‘জেপি মরগান’ একাই এ প্রান্তিকে ১৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের (১৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি।
ব্যাংক অব আমেরিকা মুনাফা করেছে ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছর ছিল প্রায় ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া সিটিগ্রুপ, মরগান স্ট্যানলি, গোল্ডম্যান স্যাকস ও ওয়েলস ফার্গোর প্রতিটিই প্রথম প্রান্তিকে ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) ডলারের বেশি মুনাফা করেছে। আগের বছরের একই সময় এ ব্যাংকগুলোর মুনাফা ছিল ৪ দশমিক ১ থেকে ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। ব্যাংকগুলোর ফিক্সড ইনকাম, কারেন্সি ও পণ্য বা সংক্ষেপে ‘এফআইসিসি’ ট্রেডিং শাখাগুলো থেকেই সবচেয়ে বড় অঙ্কের মুনাফা এসেছে।
গোপন চাল: যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তি এখনো যেভাবে ভেস্তে দিতে পারেন নেতানিয়াহুপ্রেডিকশন মার্কেটের জুয়াড়িরা
এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে অনলাইন ‘প্রেডিকশন মার্কেট’ বা অনলাইনে বাজি ধরার প্ল্যাটফর্মগুলোতে সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। ‘পলিমার্কেট’ ও ‘কালশি’র মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে মূলত যেকোনো বাস্তব ঘটনার সম্ভাব্য ফলাফলের ওপর অর্থ বাজি ধরা হয়।
গত ২৩ মার্চ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়ার ঠিক ১৬ মিনিট আগে তেলের ফিউচার্স মার্কেটে (তেলের আগাম বাজার) আকস্মিকভাবে ৫৮ কোটি (৫৮০ মিলিয়ন) ডলার চলে আসে। ফলে বাজারে সাধারণ সময়ের তুলনায় ৯ গুণ বেশি লেনদেনের হিড়িক পড়ে।
বর্তমানে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাজি ধরার প্ল্যাটফর্ম ‘পলিমার্কেট’ বড় ধরনের একটি ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’ (গোপন তথ্য ফাঁস করে ব্যবসা করা) কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ বিতর্কের সঙ্গে ট্রাম্প পরিবারের স্বার্থের সংঘাত জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে অন্তত ৫০টি নতুন খোলা অ্যাকাউন্ট থেকে যুদ্ধবিরতির পক্ষে লাখ লাখ ডলার বাজি ধরা হয়।
অনলাইন বাজি ধরার এমন ধরন বা প্যাটার্ন নিয়ে একটি বিশদ বিশ্লেষণ করেছে বিশ্বখ্যাত ইয়েল ইউনিভার্সিটি। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা ২ লাখের বেশি বাজির মধ্যে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই অ্যাকাউন্টগুলো জিতেছে।
গবেষকেরা বলছেন, গোপন তথ্য আগে থেকে জানা না থাকলে সাধারণ ভাগ্যের জোরে বাজিতে জেতার হার এতটা বেশি হওয়া পরিসংখ্যানগতভাবে একেবারেই অসম্ভব। এ ধরনের সন্দেহজনক লেনদেন থেকে আনুমানিক ১৪ কোটি ৩০ লাখ (১৪৩ মিলিয়ন) ডলার মুনাফা তুলে নেওয়া হয়েছে।
অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্
হরমুজ প্রণালিতে হামলা ইরানের, আটকে পড়া হাজারো নাবিক উদ্ধারের অভিযান স্থগিত






