ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে প্রয়াস চলছে, তা একদিকে যেমন আশাবাদের সৃষ্টি করছে, একই সঙ্গে অনিশ্চয়তার দোলাচলও তাতে রয়েছে। দেশ দুটির মধ্যে শান্তিচুক্তি মানে বিশ্বজুড়ে আশাবাদের পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম কমে যাওয়া। আবার মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং প্রবৃদ্ধি হ্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, যুদ্ধবিরতি বা একটি রাজনৈতিক চুক্তি কখনোই স্থায়ী শান্তির সমার্থক নয়। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিটিকে অনেক বিশ্লেষক একটি চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং শান্তির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসাবে দেখছেন। কারণ এখনো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগসহ বহু জটিল বিষয় পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।
সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দু রয়ে গেছে ইসরাইল ও লেবানন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বারবার স্পষ্ট করে বলেছেন, ইসরাইল তার জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রয়োজন মনে করলে লেবাননে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে। তার বক্তব্যে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা হলেও ইসরাইল তার নিজস্ব নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ইসরাইলের দৃষ্টিতে হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা হুমকি। ফলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, লেবাননই বর্তমান শান্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে ইরান মনে করে, লেবাননে অব্যাহত ইসরাইলি সামরিক অভিযান এ নতুন সমঝোতার চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে আশাবাদ ও সতর্কতার উভয় কারণই খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৭৮ সালের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি মিসর ও ইসরাইলের মধ্যে দীর্ঘদিনের যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটিয়ে এমন একটি শান্তির ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা কয়েক দশক ধরে টিকে আছে। একইভাবে ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তি উত্তর আয়ারল্যান্ডে দীর্ঘ সংঘাতের অবসানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, দীর্ঘদিনের শত্রুতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি এবং বাস্তবসম্মত নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে স্থায়ী শান্তিতে রূপ নিতে পারে। তবে বিপরীত উদাহরণও রয়েছে। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করলেও শেষ পর্যন্ত ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। কারণ মূল রাজনৈতিক বিরোধগুলোর সমাধান কখনোই সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা প্রযোজ্য-শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করাই যথেষ্ট নয়; তার কার্যকর বাস্তবায়ন, পারস্পরিক আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি।
বর্তমান চুক্তির একটি ইতিবাচক দিক হলো অর্থনৈতিক প্রণোদনা। ইরান আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে আবারও সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হতে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তার অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ যত বাড়বে, সংঘাতের দিকে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা তত কমবে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা কমিয়ে আনে। সাম্প্রতিক সংঘাতের মানবিক মূল্যও ছিল অত্যন্ত বড়। হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণ যুদ্ধের ক্লান্তি অনুভব করছে। সাধারণ মানুষ এখন স্থিতিশীলতা, পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার চায়। এ জনমতও শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তবুও বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অনেক যুদ্ধবিরতি ও শান্তি উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েছে। কখনো সীমান্তে একটি ছোট সংঘর্ষ, কখনো একটি রকেট হামলা, কখনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, আবার কখনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ পুরো প্রক্রিয়াকে বিপর্যস্ত করেছে। ইসরাইল ও ইরান উভয় দেশেই এমন রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে, যারা আপসের বিষয়ে সন্দিহান। ফলে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা ভুল হিসাবও পরিস্থিতিকে আবার উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সুতরাং বর্তমান বাস্তবতাকে সবচেয়ে সঠিকভাবে বর্ণনা করা যায় এভাবে যে, বৃহৎ আকারের যুদ্ধের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি এখনো নিশ্চিত হয়নি। এটি একটি সুযোগের জানালা, একটি সম্ভাবনার মুহূর্ত। যদি আগামী মাসগুলোয় পারমাণবিক ইস্যু, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা এবং লেবাননসংক্রান্ত প্রশ্নগুলোয় কার্যকর অগ্রগতি হয়, তাহলে ইতিহাস হয়তো এ সময়কে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন যুগের সূচনা হিসাবে স্মরণ করবে। আর যদি আলোচনাগুলো ব্যর্থ হয়, তাহলে বর্তমান যুদ্ধবিরতি কেবল আরেকটি সাময়িক বিরতি হিসাবেই বিবেচিত হবে।
সবচেয়ে বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন হলো, মধ্যপ্রাচ্য রাতারাতি শান্তির স্বর্গে পরিণত হবে না, আবার তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধেও ফিরে যাবে না। কারণ এ অঞ্চলের সংঘাত কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি, আর একদিনে তার সমাধানও সম্ভব নয়। কয়েক দশকের রাজনৈতিক অবিশ্বাস, মতাদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সামরিক জোট, প্রক্সি যুদ্ধ এবং ঐতিহাসিক ক্ষোভের যে জটিল স্তর এখানে গড়ে উঠেছে, তা একটি মাত্র চুক্তির মাধ্যমে মুছে ফেলা যায় না। তবে এটাও সত্য, ইতিহাসের প্রতিটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি কোনো-না-কোনো ছোট পদক্ষেপ থেকেই শুরু হয়েছে। আজকের এ সমঝোতা হয়তো সেই ধরনের একটি পদক্ষেপ, যা ভবিষ্যতে বৃহত্তর স্থিতিশীলতার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান চুক্তি অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে-যুদ্ধের পরও আলোচনা সম্ভব, শত্রুতার পরও সমঝোতা সম্ভব এবং দীর্ঘ সংঘাতের পরও শান্তির পথ উন্মুক্ত থাকতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি ধারণা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, সামরিক শক্তিই একমাত্র ভাষা, যা প্রতিপক্ষ বুঝতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি দেখিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যও শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই টেকসই রূপ পায়।
এখন প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষর করা তুলনামূলকভাবে সহজ; কঠিন হলো সেটি বাস্তবায়ন করা। ইতিহাসে বহু শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের অভাবে সেগুলোর অনেকই ব্যর্থ হয়েছে। তাই আগামী দিনগুলোয় শুধু কূটনৈতিক ঘোষণার দিকে নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপের দিকে নজর রাখতে হবে। সীমান্তে উত্তেজনা কমছে কি না, সামরিক অভিযান সত্যিই বন্ধ হচ্ছে কি না, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্বচ্ছতা আসছে কি না, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার হচ্ছে কি না-এসব বিষয়ই হবে প্রকৃত অগ্রগতির সূচক। চুক্তির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে পারস্পরিক আস্থার ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলোর অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো বিশ্বাসের গভীর সংকট। প্রতিটি পক্ষই অন্য পক্ষের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান। ইরান আশঙ্কা করে, পশ্চিমা শক্তিগুলো তাদের ওপর চাপ বজায় রাখতে চাইবে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আশঙ্কা করে, ইরান ভবিষ্যতে আবারও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করতে পারে। একইভাবে ইসরাইল তার নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে থাকে, আর আরব বিশ্বের বহু জনগোষ্ঠী ইসরাইলের সামরিক নীতিকে সন্দেহের চোখে দেখে। এ দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস দূর করা কোনো সহজ কাজ নয়; কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এটি অপরিহার্য।
এখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে অনেক শান্তি উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে, কারণ কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি ছিল না। কিন্তু যদি জাতিসংঘ, ইউরোপীয় শক্তি, যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং আঞ্চলিক দেশগুলো এ প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে এবং চুক্তির বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, তাহলে এর সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, পুনর্গঠন প্রকল্প এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ শান্তির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, যুদ্ধের ক্ষত শুধু রাষ্ট্রের নয়, মানুষেরও। হাজার হাজার পরিবার তাদের স্বজন হারিয়েছে, অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, বহু শহর ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। তাই স্থায়ী শান্তি শুধু রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে আসবে না; এর জন্য প্রয়োজন মানবিক পুনর্মিলন, পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। আক্রমণ, প্রতি আক্রমণ, ঘৃণা ও প্রতিশোধের রাজনীতি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে কোনো চুক্তিই দীর্ঘমেয়াদে টিকবে না।
মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন : নিরাপত্তা বিশ্লেষক








