ইতালির রাজধানী রোমের পিনেতা সাচ্চেত্তি এলাকার একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে এক প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারের তিন সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। স্থানীয় সময় ২৬ জুন (শুক্রবার) দিবাগত গভীর রাতে অরেলিও অঞ্চলের ভায়া মন্তিমিও সড়কের ৩৫ নম্বর ভবনে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন ৩৯ বছর বয়সী গৃহকর্তা কামাল উদ্দিন, তাঁর স্ত্রী আরজু (৩৮) এবং তাঁদের ৮ বছর বয়সী কন্যাসন্তান আরোয়া ইসলাম আরিশা ওরফে আলিসিয়া। তাঁদের বাড়ি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়।
এ সময় গুরুতর আহত অবস্থায় বেঁচে গেছেন এই দম্পতির ২০ বছর বয়সী বড় ছেলে। রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরের বাইরে থেকে তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত রোমের পলিক্লিনিকো আগোস্তিনো জেমেলি হাসপাতালে পাঠানো হয়। প্রথম দিকে তাঁকে অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পুলিশ পরে তাঁর সঠিক বয়স নিশ্চিত করেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তিনি বর্তমানে শঙ্কামুক্ত।
কামাল উদ্দিনের পরিবার স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত নম্র ও নিরপরাধ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইতালি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই পরিবারের কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড ছিল না।
কামাল উদ্দিনের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর ভাতিজা আরিফ কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আলিসিয়া খুব মিষ্টি আর শান্ত একটা মেয়ে ছিল। গত সোমবার ও আমার দোকানে এসে আমার সঙ্গে পিৎজা বানিয়েছিল। ও বলছিল, এই পিৎজাটা ও ওর বাবার জন্য নিয়ে যাবে। কারণ, ওর বাবা সেদিন আমাদের সঙ্গে আসতে পারেননি।’
মাথা নেড়ে আরিফ আক্ষেপ করেন, ‘সব শেষ হয়ে গেল। কেন যে এমন নির্মম ঘটনা ঘটল, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।’
হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে শুক্রবার রাত আনুমানিক ১০টা ৩০ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় রোম পুলিশের বিশেষ তদন্ত দল ‘স্কোয়াড্রে মোবিল’ এবং ফরেনসিক সায়েন্টিফিক ইউনিট।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, ঘাতক নিহত ব্যক্তিদের পূর্বপরিচিত এবং সম্ভবত তাঁদেরই কোনো স্বদেশি বন্ধু বা পরিচিত কেউ। ঘরের প্রধান দরজা বা জানালায় জোরপূর্বক প্রবেশের কোনো চিহ্ন না থাকায় পুলিশ নিশ্চিত, পরিচিত ব্যক্তি হওয়ার কারণেই রাতে তাঁর জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়েছিল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটন এবং খুনিকে দ্রুত শনাক্ত করতে একাধিক স্তরে কাজ করছে:
১. ডিজিটাল আলামত: নিহতদের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড এবং শেষ মুহূর্তের যোগাযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার রাতে পিনেতা সাচ্চেত্তি এলাকায় কারও সঙ্গে তাঁদের কোনো পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎ ছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
২. সিসিটিভি ফুটেজ: ওই আবাসিক এলাকা এবং সংলগ্ন সড়কের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর ফুটেজ সংগ্রহ করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
৩. পুলিশ ইতিমধ্যে নিহত ব্যক্তিদের স্বজন, প্রতিবেশী এবং পরিচিতদের জবানবন্দি রেকর্ড করা শুরু করেছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২০ বছর বয়সী তরুণের জবানবন্দিকে এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখছে পুলিশ। রোম পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খুনিকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে সব ধরনের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তৎপরতা ব্যবহার করা হচ্ছে।








