চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মনসুরাবাদ এলাকার বাসিন্দা মিয়া হারুন খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মঙ্গলবার দুপুরে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। এতে দেখা যায়, তার বাসায় পানি ঢুকেছে। পানিতে তার ফ্রিজ, আলমিরাসহ দামি দামি সব আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘এটাই কী আমাদের প্রাপ্য ছিল। ২৫ বছরে আমার বাসায় এ ধরনের পানি ওঠেনি।’ চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের ওপর তিনি ক্ষোভ ঝাড়েন। নালা-নর্দমা পরিষ্কার না করায় তার বাসায় পানি উঠেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ ও কষ্টের এ হাহাকার কেবল হারুনের নয়। এটা চট্টগ্রাম শহরের নিচু এলাকার লাখ লাখ বাসিন্দার।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। যা ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। সোমবার বিকাল ৩টা থেকে ২৪ ঘণ্টার বর্ষণে নগরীর নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। নগরীর পোর্ট কানেকটিং সড়কের হালিশহর আবাসিক থেকে নয়াবাজার পর্যন্ত অংশ, অক্সিজেন-হাটহাজারী সড়কের বড় দিঘিরপাড় অংশ এবং আরাকান সড়কের সিঅ্যান্ডবি ও মৌলভী পুকুরপাড় এলাকার সড়ক তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটু পানি। কোথাও কোমর পানি। যেন পুরো চট্টগ্রামই এক বহতা নদীতে পরিণত হয়। বাসাবাড়ি ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে যায়। লেপতোশক, ঘটি-বাটি নিয়ে গলাসমান পানি মাড়িয়ে বাসিন্দাদের অনেককে অন্যত্র আশ্রয় খুঁজতে দেখা যায়। ষোলশহর জানআলী হাট রেললাইনের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় কক্সবাজারগামী ৬৫০ জন যাত্রী নিয়ে পর্যটক এক্সপ্রেস কয়েক ঘণ্টা আটকা পড়ে। পতেঙ্গা আউটার রিং রোডের একটি অংশ ভেঙে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। টানা ভারি বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় চট্টগ্রামে বিমান চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। তিনটি ফ্লাইট নামতে পারেনি এবং কয়েকটি বিলম্বে ছাড়ে।

চসিকের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বড়দিঘির পাড় এলাকায় অক্সিজেন-হাটহাজারী সড়কের ওপর দিয়ে গলাসমান পানি প্রবাহিত হয়। এ সড়কে স্থানীয়দের জাল ফেলে মাছ ধরতে দেখা যায়। তারা বলেন, ৩০ বছরে এ সড়ক এভাবে কখনো ডোবেনি। এবারের বৃষ্টিতে ডুবল। নগরীর চকবাজার, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, বহদ্দারহাট, ষোলশহর, মুরদাপুর, ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের আকমল আলী রোড, বহদ্দার হাট, মুরাদপুর, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, জামালখান বাইলেন, পতেঙ্গা আকমল আলী রোডসহ অর্ধশতাধিক স্পটে কোমর থেকে গলাসমান পানি প্রবাহিত হয়। শুলকবহর ও কাতালগঞ্জ এলাকায় বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে বাসিন্দাদের যে দুর্বিষহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তার ভিডিও ফেসবুক আইডিতে আপলোড করেন হেলালী। পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, রাস্তার ওপর দিয়ে যে পানি প্রবাহিত হচ্ছে তার চেয়ে বেশি পানি বাসাবাড়িতে ঢুকেছে। পাম্প দিয়ে পানি সেচে দুর্দশা লাঘবের চেষ্টা করেছেন অনেকে। জলাবদ্ধতা নিয়ে রাজনীতি না করে স্থায়ী সমাধানে সরকারের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

সোমবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন নগরীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে মন্তব্য করেন, সিটি করপোরেশনের খাল-নালা পরিষ্কার করা, পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম জোরদার করাসহ প্রধানমন্ত্রীর মনিটরিংয়ের কারণে দুদিনের বৃষ্টিতেও নগরীতে উল্লেখযোগ্য পানি ওঠেনি। কিন্তু তৃতীয় দিনের বৃষ্টিতে নগরীর অধিকাংশ নিচু এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার চিত্রে তার সেই মন্তব্য নগরবাসীর কাছে ‘উপহাসে’ পরিণত হয়। মঙ্গলবার নগর পরিদর্শনে বের হয়ে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, হিজড়া খাল, জামালখান খাল, আজববাহার খাল ও গুলজার খালের কাজ চলায় আশপাশের নিচু এলাকায় পানি উঠেছে। সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড কাজ করছে। করপোরেশনও নালা-নর্দমা পরিষ্কারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। জলাবদ্ধতা পুরোপুরি নিরসনে সময় দিতে হবে। বৃষ্টি থামলে পানি এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে নেমে যাবে। তিনি আরও বলেন, নগরীর ৭০ শতাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়নি। বাকি ৩০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতার শিকার। প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হলে নগরীতে আর জলাবদ্ধতা থাকবে না।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক বোর্ড মেম্বার আশিক ইমরান যুগান্তরকে বলেন, জলাবদ্ধতার জন্য এককভাবে কাউকে দোষ দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিদিন খালে-নালায় এক হাজার থেকে ১২শ টন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। তাই খাল-নালার নাব্য থাকছে না। এতে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ৩০ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে যেমন ঠিক; তেমনি জলাবদ্ধতা দূর হয়নি সেটাও ঠিক। যতক্ষণ পাহাড় কাটা বন্ধ না হবে, খাল-নালায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ না হবে ততক্ষণ জলাবদ্ধতাও দূর হবে না। তাই জলাবদ্ধতা সংকটের গোড়ায় হাত দিতে হবে। নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী বলেন, ভয়াবহ জলাবদ্ধতা নিয়ে সিটি মেয়র এবং উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা মিথ্যাচার করছেন। উন্নয়ন প্রকল্প স্টেকহোল্ডার, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করে নেওয়া উচিত ছিল।

৬৫০ জন যাত্রী নিয়ে পর্যটক এক্সপ্রেস আটকা : টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকার রেললাইনের ওপর পানি জমে যায়। এ কারণে কক্সবাজারের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে ভারি বৃষ্টিতে ষোলশহর এলাকায় রেললাইনে পানি জমে গেলে দুর্ঘটনা এড়াতে পর্যটক এক্সপ্রেস থামিয়ে দেওয়া হয়। পরে ট্রেনটি পিছিয়ে ষোলশহর স্টেশনে এনে রাখা হয়। মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৬টায় রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে ৬৫০ জনের বেশি যাত্রী নিয়ে পর্যটক এক্সপ্রেস যাত্রা করে।

নামতে পারেনি তিনটি ফ্লাইট : টানা ভারি বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি ফ্লাইট অবতরণ করতে পারেনি। মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ফ্লাইট তিনটি চট্টগ্রামে অবতরণে ব্যর্থ হয়ে ঢাকায় ফিরে গেছে। সবকটি এরাইভাল ও ডিপার্চার ফ্লাইট স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আধ ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হয়েছে। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল জানান, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিএস-৩৫০ (আবুধাবি-চট্টগ্রাম) ফ্লাইটটি চট্টগ্রামে অবতরণ করতে না পেরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়। একই কারণে এয়ার আরাবিয়ার জি-৯-৫২৬ (শারজাহ-চট্টগ্রাম) ফ্লাইটটিও ঢাকায় অবতরণ করানো হয়। এছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-১২১ (ঢাকা-চট্টগ্রাম) ফ্লাইটটি চট্টগ্রামে অবতরণ সম্ভব না হওয়ায় পুনরায় ঢাকায় ফিরে যায়।

চট্টগ্রামে দেয়াল ধসে যুবকের মৃত্যু : নগরীর পাঁচলাইশ থানার রহমাননগর এলাকায় বাউন্ডারি ওয়াল ধসে যুবক শফিকুর রহমানের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে টানা বর্ষণে মাটি আলগা হয়ে দেয়াল টিনের ঘরে ধসে পড়লে শফিকসহ কয়েকজন বাসিন্দা চাপা পড়ে। এতে শফিকের মৃত্যু হয় এবং আরও চারজন আহত হন। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মৃত শফিকের বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে। পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল ইসলাম বলেন, রহমাননগর আবাসিক এলাকায় প্রবল বর্ষণে দেয়ালের নিচের মাটি সরে গেলে সেটি কয়েকটি ঘরের ওপর ধসে পড়ে। এতে ঘরে থাকা লোকজন চাপা পড়ে। স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে নামে। দেওয়ালের নিচ থেকে যুবক শফিকুর রহমানের লাশ উদ্ধার করা হয়। আহত চারজনকে উদ্ধার করা হয়।

বহির্নোঙরে ৪৩ জাহাজ থেকে পণ্য খালাস স্থগিত : টানা বর্ষণ ও সাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস স্থগিত করা হয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে বন্দর কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বহির্নোঙরে আমদানি পণ্যবাহী ৪৩ টি মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) অবস্থান করছিল। সূত্র জানায়, পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ নম্বর সতর্কতাসংকেত জারি করা হয়। এরপর ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে নৌযান ও লাইটারেজ চলাচলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এ কারণে নৌযানগুলো তীরে নোঙর করে রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে পণ্য খালাস ও ডেলিভারি কার্যক্রম চললেও তা ছিল সীমিত। বৈরী আবহাওয়ার কারণে লোকজনের উপস্থিতিও কম ছিল।