রাজনীতিতে সরকারি দল আর জনগণের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হয় কালেভদ্রে। এ অভিযোগ তো মিথে পরিণত হয়েছে। এ দুর্নাম ঘুচিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি নিজে যেমন, তেমনি তার মন্ত্রী-এমপিরা প্রতি সপ্তাহেই তাদের নির্বাচনি এলাকায় যাচ্ছেন। সরকারের চার মাস হয়ে গেছে এখনো পর্যন্ত কোনো মন্ত্রী/এমপিকে সংবর্ধনা নিতে দেখিনি। এটা কোনো কাজের কাজ হলো? সংসদ সদস্য/মন্ত্রী যদি সংবর্ধনাই না নেবেন, তাহলে তিনি ওইসব পদে যোগ দিলেন কেন? সংবর্ধনা নেওয়ার যে রীতি অতীতে আমাদের দলীয় কর্মীদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দিত, তা তো করতে পারল না বর্তমান বিএনপি! তার মানে কি দলের নীতি-আদর্শ পালটে গেল?

মনে হচ্ছে, বিএনপি তার খোলস পালটে নতুন রূপ নিচ্ছে। এ সত্য তো প্রতিদিনই দেখতে পাচ্ছি আমরা। এমপিরা তো প্রমাণ করবেন যে, তিনি সাধারণ কেউ নন, কেউকেটা। বিএনপি জিতেছে ২০৮ আসনে, কিন্তু কেউকেটা হতে পারেনি। বরং উলটোটা হয়েছে। গলায় জোর নেই। দেখিয়ে দেওয়ার মাস্তানি নেই। এই পরিস্থিতিতে রাজনীতিটা হবে কেমন করে? পুরোনো ধাঁচের রাজনীতির সঙ্গে আমরা মেলাতে পারছি না বর্তমান বিএনপিকে।

রাজনৈতিক ময়দানে আওয়ামী লীগ নেই। তাই কি খালি ময়দানে বিএনপি একা বল নিয়ে ছুটছে? এবং গোল দিয়ে ফিরছে নিজের পজিশনে। গোলবারে কোনো গোলকিও নেই যে বল ঠেকাবে। খালি মাঠে গোল দেওয়া সহজ।

সহজ! অতোই সহজ হলে তো কথাই ছিল না। বল খেলার রীতিনীতিও তো জানতে হবে। সেন্টারপয়েন্টে উভয়পক্ষ দাঁড়িয়ে আছে যার যার পজিশনে, বল কোন দিকে যাবে বলা যায় না। তারেক রহমান ঠিক করেছেন, তিনি গোলেই বলটা মারবেন। বাতাসের বেগ ও প্রগতির গতি বুঝে তিনি জনগণের ময়দানে কিক করলেন। গোওওওল।

না, এমন সহজ ও সরল নয় রাজনীতির ময়দান। কাঁটা আর ক্রিটিকে ভরা সেই ময়দান। প্রতিদিনই তো টিভির বিভিন্ন টকশোতে শুনছি। এটা গেল তো সেটা রইল পড়ে, ইত্যাদি। একতরফা কাজে মজা কম, লক্ষ্য অর্জনে সেখানে পৌঁছানোও কঠিন। যেন হাওয়ায় হাওয়ায় এআই প্রযুক্তির অদৃশ্য প্রতিযোগী দাঁড়িয়েছে গোলবারে।

২.

এখন সমালোচনা করা যাক সরকারের প্রশাসনের স্ট্রাকচার নিয়ে। এটা অতি পুরোনো-জীর্ণ জনসেবার এক ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান। আমলা নামক চরিত্র, মনে হয় কোন দূর দেশের মানুষ। আসলে তারা আমাদেরই ছাওয়াল-পাওয়াল। শিক্ষা নিয়ে সরকারের প্রশাসনে চাকরি পেয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে আমলা চরিত্রচর্চা করে মূল্যবান মানুষ হয়েছে। এদের কর্মদক্ষতা অনন্য সাধারণ। প্রশাসন কী করে চালাতে হয়, তার সবকিছুই তাদের নখদর্পণে।

এরা প্যাঁচ লাগাতে ওস্তাদ। কেননা, তারা জানে কী থুয়ে কী করলে কী হয়। সেই আইনি প্যাঁচের ফেরে পড়ে রাজনৈতিক চরিত্র উলটে যায়। কান পড়া দিতে তারা যথেষ্ট দক্ষ। এ দক্ষতার জোরে তারা রাজনীতিকদের আদরের মানুষ হিসাবে পরিগণিত হয়।

আমলাদের আলস্য, জড়তা, দলীয় চিন্তার খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে। তাহলেই শুধু সব বাধাবিপত্তি দূর করা সম্ভব। আমলাদের জন্য আপাতত প্রণোদনা নেই। পলিটিক্সকে পুরোনো ‘পলিটিক্যাল অ্যারেনা’ থেকে কিছুটা মুক্ত করে এনেছেন তারেক রহমান এবং তার দল বিএনপি। এই যে রাজনীতিকে ‘সংস্কৃত’ করে তোলা, তা বিএনপি করেছে। দলকে যেমন সংস্কারের রাখতে হবে, তেমনি প্রশাসনকে সংস্কার করে নতুন মূল্যবোধে দাঁড় করাতে হবে, না হলে এ পুরোনো মেশিনে নতুন চিন্তা ও রোল মডেল নির্মাণ করা সম্ভব নয়।

আমরা ধারণা করি, সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষ হচ্ছে মূলত সহযোগী। কিন্তু ১৩তম সংসদের প্রতিপক্ষ ১১ দলীয় জামায়াত জোট, সহযোগী হতে পারেনি। তারা প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে। প্রতিপক্ষ সবসময় ক্ষমতাসীনদের দোষ-ত্রুটি ধরে রাজনীতি করে। ইতিবাচকতা তারা বাদ দেন। জামায়াত মাত্র দুমাসের সংসদীয় গণতন্ত্রের সরকারকে স্বস্তির সঙ্গে কাজ করতে দেয়নি। ওই সময়ের মধ্যেই তারা চারবার ওয়াকআউট করেছে সংসদ থেকে। কোন কোন যুক্তিতে তারা ওয়াকআউট করেছেন তা জাতি জানে। কিন্তু জাতি বুঝতে পারছে না যে, জামায়াত আসলে কী চায়? আগে সেটা বুঝতে হবে; তারপর আমরা বলব, কৃষির স্বার্থে তারা সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে জনগণের জন্য কাজ করবেন।

৩.

প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করেছেন। অনেক জল্পনার অবসান হয়েছে। সবাই, মানে বিরোধী চিন্তার অনেক প্রজ্ঞাবান ভেবেছিলেন তিনি সীমান্ত প্রতিবেশী ভারতের মাধ্যমে তার বিদেশ সফর শুরু করবেন। কোনো কোনো রাজনৈতিক ভাষ্যকার বলেছিলেন, তিনি চীন সফর দিয়ে তার গণতান্ত্রিক সরকারের বিদেশমুখী রাজনীতির সূচিমুখ খুলবেন। কেননা, তিস্তা নদীর সমস্যা-সংকট মোচনে চীনের কাছে তিনি ছেড়ে দেবেন তিস্তা মহাপরিকল্পনা। চীন যদি তিস্তা মহাপরিকল্পনার দায়িত্ব নেয়! ইতোমধ্যেই রংপুরের তিস্তা-অঞ্চল সমীক্ষা করে চীন প্রমাণ করেছে যে, তারা এই প্রকল্পের জন্য মুখিয়ে আছেন। কাজটা তো শুধু সহযোগিতা নয়, চীনের বিনিয়োগ ও ব্যবসাও, সেটা আমরা কখনোই উল্লেখ করি না। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কী কী করা হবে, তা ইতোমধ্যেই জানা হয়ে গেছে আমাদের। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কী লাভ হবে, তাও আমরা কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি। ওই কল্পনার ওপারে আছে ভারতের ব্যাদান করা মুখ। তারাও তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বিনিয়োগ করতে চায়। ২০২৪ সালের সেই প্রস্তাবের পর তাদের কোনো ‘রা’ আর নেই। হাসিনা চলে যাওয়ার পর ভারত সরকারের নীতি-চেতনায় ফাটল ধরেছে।

ভূরাজনৈতিক বিবেচনার কথা নাই বা বললাম। চীন তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে ভারত নাখোশ হবে, এরকম ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেকেই কাতর স্বরে বলেন, ভারতকেই এ প্রকল্প দেওয়া উচিত। নইলে সমূহ বিপদ। তারা ঠিক বলেছেন। আমরা তো দেখতেই পাচ্ছি। নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্র আর প্রান্ত পশ্চিমবঙ্গ মিলে প্রতিদিনই বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে পুশইন করছে। তারা পুশইন চাপ দিয়ে কী বোঝাতে চাইছে, তা সরল বাংলাদেশিও বুঝতে পারছে। আমাদের ভাগ্য ভালো বলতে হবে, সীমান্তে আজ যে বিজিবি কাজ করছে, তারা হাসিনার রেখে যাওয়া ব্যাকবোনলেস সদস্য নয়, তারা দেশের সন্তান। ঠিকঠাক জবাব দিচ্ছে। অসংখ্য টার্গেটকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়নি। এই পুশইন চাপ শেষ না করেই তিস্তার গজলডোবা থেকে পানি ছাড়ছে। গজলডোবায় ভারতের বিশাল তিস্তা জলাধার, ভাটিতে ফারাক্কায় বাঁধ। ওই বাঁধ ছাড়াও তিস্তার ওপর আছে উজানে আরও দুটি ব্যারাজ, সেখান থেকেও পানি শুষে নিয়ে ভিন্ন নদীতে প্রবাহিত করছে। এ কারণেই পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কেন্দ্রের ওপর নাখোশ ছিলেন।

তিস্তার ওপরে ভারত নিজেরই মাত্র তিনটি ব্যারাজ নির্মাণ করেছে, যাতে বাংলাদেশের ভেতরে থাকা তিস্তা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। তারাই তো গজলডোবা ব্যারাজ থেকে বর্ষার সময় পানি ছেড়ে দিয়ে এবারও উত্তরবঙ্গ ডুবিয়ে দিয়েছে। ফসলের কী রকম ক্ষতি হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান কি দেওয়া জরুরি? ওটা ফি বছরের ঘটনা। এমন নিখুঁত পরিকল্পনার ক্ষতিকারীরা, যারা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করেন, তারা যে মোদির দালালচক্র, তা না বললেও চলে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে তিস্তা নদী প্রকল্পে চীনের প্রতিশ্রুতি মিলেছে। এতে মনে হতে পারে আমরা চীনের পক্ষের মানুষ। আমরা চীনা স্বার্থরক্ষাকারী দালাল। যে দালালি দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখে, সেটাই তো উত্তম। আমি দেশের জন্য উত্তম যা, তা-ই বিবেচনা করি।

৪.

আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ভঙ্গুর। না, সড়কপথ, না রেলপথ, কোনো পথেই সুখকর কোনো যাতায়াত ব্যবস্থা নেই। শুনছি, তারেক রহমান চীনের সহযোগিতায় আমাদের দেশে সহজ রেলপথ তৈরি করতে চান। দূরপাল্লার দ্রুতগতির রেলযাত্রার জন্য সমগ্র বাংলাদেশকে একই নেটওয়ার্কের মধ্যে আনতে চান, যা অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যের হবে।

এই সিদ্ধান্ত ভালো না মন্দ হবে, বলুন তো। আমরা কি সহজ যাতায়াত চাই না?

ভেবে দেখুন আমরা কী চাই। কোন পথ আমাদের জন্য ভালো ফল দেবে। যে ব্যবস্থা আমাদের স্বার্থরক্ষা করবে, সেটাই হবে জনগণের সিদ্ধান্তের ফল। আমরা জনগণের সিদ্ধান্তের পক্ষে কাজ করি, করব।

ড. মাহবুব হাসান : কবি ও সাংবাদিক