তিস্তাপারের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে জাতীয় সংসদে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিকে আমি স্বাগত জানাই। আমার যতটুকু মনে পড়ে, তিস্তা নিয়ে বড় প্রকল্প ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি ইশতেহারে ছিল এবং তাদের নির্বাচনি বিভিন্ন সভায় এ বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। তিস্তাকেন্দ্রিক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগের বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন সময়ে প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সত্যি বলতে কী, তিস্তা পরিকল্পনা মাঝপথে থেমে গিয়েছিল, যদিও এই পরিকল্পনার কথা বলে ওই এলাকার নদী ব্যবস্থাপনায় আর কোনো টেকসই প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছিল না। সঙ্গত কারণেই তিস্তাপারের মানুষ সংক্ষুব্ধ।

আমি নিজে যেহেতু বহুবার তিস্তাপারে গিয়েছি, তিস্তা নদী আর নদীনির্ভর মানুষের দুর্দশা যে কতটা ভয়াবহ, তা আমি জানি। ফলে তিস্তাপারের মানুষকে নদীভাঙন, বন্যা আর সেচের পানির স্বল্পতার মতো ত্রিমুখী সংকট থেকে বাঁচাতে আর একই সঙ্গে নদীটিতে প্রাণ আনতে এবং নদীনির্ভর জেলে, কৃষককে বাঁচাতে সাধারণভাবে পরিচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনার’ প্রাসঙ্গিকতা আর এর বাস্তবায়নের বিষয়টি আমি বোঝার চেষ্টা করেছি। আমি যতটুকু বুঝি, তিস্তার মতো ভাঙনপ্রবণ এবং বহু সম্ভাবনা আর চ্যালেঞ্জের এই নদীকে ঘিরে প্রকল্প গ্রহণে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ যেমন অত্যন্ত জরুরি, তেমনি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আর জনসম্পৃত্ততা। আমি তাই প্রকল্প প্রণয়নকারী সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছিলাম তিস্তার ৫ জেলায় জেলা প্রশাসকদের উপস্থিতিতে গণশুনানি করে প্রকল্প প্রস্তাবে এর প্রতিফলন ঘটাতে। তিস্তাপারের মানুষের মতামতগুলো আমরা চীনে পাঠিয়েছি এবং সংশোধিত প্রতিবেদনে তা অন্তর্ভুক্তির অনুরোধ জানিয়েছি।

এই প্রকল্প প্রস্তাবনার প্রথম সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন (এপ্রিল, ২০১৯) পরিবর্তন করে দ্বিতীয় যে প্রতিবেদন আগস্ট, ২০২৩-এ জমা দেওয়া হয়েছে, সেখানে প্রকল্পটি দুই ভাগে বাস্তবায়নের কথা বলা আছে। প্রথম ভাগে বন্যা প্রতিরোধে বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ, নদী খনন, নদীতীর প্রতিরক্ষা, সবুজায়ন, জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন কাজের কথা বলা আছে। দ্বিতীয় ভাগে এই কাজগুলোর অবশিষ্ট অংশ শেষ করার পাশাপাশি তিস্তা ব্যারাজের রিজার্ভের এলাকা ড্রেজিং ও নৌপরিবহণসংক্রান্ত কাজের কথা বলা আছে। এই দ্বিতীয় প্রতিবেদনটির আর্থিক ও কারিগরি দিকের ওপর চীনের বিশেষজ্ঞরা যাচাই-বাছাই করছেন। আমার ধারণা, বর্তমান সরকারও প্রকল্প প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই করছে। মনে রাখতে হবে বন্যা, সেচ, নদীভাঙন-এই ত্রিমুখী সমস্যা সমাধানে গৃহীত প্রকল্প অবশ্যই জটিল কারিগরি, আর্থিক, পরিবেশগত, সামাজিক বিবেচনায় চূড়ান্ত করতে হবে। এটি চূড়ান্তকরণ আর বাস্তবায়নে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।

সরকারকে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে কাজে নামতে হবে। যেহেতু সমস্যাগুলো জটিল আর তিস্তা নদীর প্রকৃতিও অন্যরকম, তাই সরকারকে বাস্তবায়ন পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে বলে আমার ধারণা। এই প্রকল্পে পলি ব্যবস্থাপনা, নদীর পানির স্রোত ও গভীরতা বজায় রাখা, নদীর পাড়ের স্থায়ী বাঁধ টেকসই করে নির্মাণ করা, নদীসংলগ্ন জলাধারগুলোর ব্যবস্থাপনা, উজানের পানিপ্রবাহের তথ্য সংগ্রহ-এই কাজগুলো নিয়মিত আর গুরুত্বের সঙ্গে করতে হবে। তিস্তার মতো আন্তঃদেশীয় নদীর ক্ষেত্রে আমরা ‘বেসিনকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনার’ ওপর জোর দিলেও উজানের দেশের সায় না থাকলে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি সরকারকে যুগপৎ অভিন্ন নদীতে বাংলাদেশের অধিকার রক্ষায় ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে ‘বেসিনকেন্দ্রিক’ ব্যবস্থাপনার চেষ্টাও চালাতে হবে। বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের আন্তর্জাতিক পানি কনভেনশনের সদস্যরাষ্ট্র। এই কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশ তিস্তা নদীতে তার পানির অধিকার আদায়ে এবং অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক আইন মেনে আঞ্চলিক উদ্যোগ গ্রহণে প্রতিবেশী দেশগুলোকে উৎসাহিত করবে বলে আমি আশা করি।

যথাযথ সমীক্ষা আর ঝুঁকিগুলো বিশ্লেষণ করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে তিস্তায় প্রাণ ফিরবে, নদীর মূলধারায় ও চ্যানেলে প্রবাহ নিশ্চিত হবে, নদীভাঙন কমবে, সেচ সুবিধা বাড়বে, প্রলয়ঙ্করী বন্যার ঝুঁকি কমবে, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে প্রাণ ফিরবে। দ্বিতীয় মেয়াদে হয়তো নৌপরিবহণ আর নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হতে পারে। রংপুর অঞ্চলের পানি প্রাপ্যতার ও ব্যবস্থাপনার চিত্র বদলাবে। তবে মনে রাখতে হবে, শেষ বিচারে এই প্রকল্পে কোন কোন কাজ চূড়ান্ত হবে, তার ওপর নির্ভর করবে এর সুফল।

নদীকেন্দ্রিক মেগা প্রকল্পে অনেক চ্যালেঞ্জ থাকে, তিস্তা প্রকল্পেও থাকবে। তবে প্রস্তাবিত (এখনো চূড়ান্ত নয়) এ প্রকল্পে যেহেতু নদীর ওপর বড় স্থাপনা নির্মিত হবে না, বরং ড্রেজিং, পাড় বাঁধাই-এসব কাজ বেশি হবে, তাই যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করে নেতিবাচকতা কমানো সম্ভব। পত্রিকায় পড়লাম তিস্তায় মাছ নেই। আশা করি এমন বাস্তবতা থেকে উত্তরণ ঘটবে। সঠিকভাবে পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন হলে পানি ব্যবস্থাপনায় ভাটির দেশ হিসাবে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়বে।

আমার কাছে প্রধান রাজনৈতিক বিবেচ্য হচ্ছে, তিস্তাপারের মানুষের পানির অধিকার নিশ্চিত করা। ভাটির দেশ হিসাবে বাংলাদেশ তিস্তা নদীতে তার প্রাপ্য পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে উজানের দেশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলো ১৯৯২ সালের কনভেনশনের আলোকে যে ধরনের সহায়তার ক্ষেত্র তৈরি করেছে, এ অঞ্চলে তা এখনো অনুপস্থিত। তিস্তাপারের মানুষের পানির অধিকার জাতীয় প্রাধিকার। জাতীয় স্বার্থে সরকার নিশ্চয়ই দীর্ঘমেয়াদে যা উপযুক্ত আর টেকসই, তা-ই করবে।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : আইনজীবী ও পরিবেশবিদ; বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা