বিশ্বের গড় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে বাংলাদেশে এই বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি-২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ মানুষ ৬৫ বছর বা তার বেশি, যা বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ কিশোর-কিশোরী এবং পৌনে পাঁচ কোটি তরুণের সংখ্যা জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ। তবে কিছু অঞ্চলে কিশোর বয়সে নারীদের গর্ভধারণের হার বেশি, যার পেছনে রয়েছে বাল্যবিয়ে, জন্মনিরোধ সামগ্রীর সীমিত ব্যবহার এবং যৌন শিক্ষার অভাব। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে জনসংখ্যা। তবে সেই হারে বাড়ছে না মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান। এতে তারুণ্যের শক্তি কাজে লাগাতে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করাই মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সারাবিশ্বের মতো আজ শনিবার দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস-২০২৬। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য-‘তরুণদের আশা ও আকাঙ্ক্ষার উপলব্ধি করা-আজ এবং ভবিষ্যতের জন্য’।

দিবসটি উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করা গেলে নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা যেমন পূরণ হবে, পাশাপাশি নিশ্চিত হবে সমৃদ্ধ আগামীর স্বপ্ন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের উন্নয়ন-অভিযাত্রার অন্যতম লক্ষ্য হলো তরুণদের সম্ভাবনাকে জাতীয় অগ্রগতির চালিকাশক্তিতে পরিণত করা। সে লক্ষ্যে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবার পরিকল্পনাকে সমন্বিত করে সরকার বহুমাত্রিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।’

সরকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২৯ লাখ। জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। মোট জনসংখ্যার ৪ ভাগের ১ ভাগ (প্রায় ২৮ শতাংশ) তরুণ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। এটি সংখ্যায় ৪ কোটি ৭৪ লাখ। অন্যদিকে ৬৫ বছরের বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ (প্রায় ১ কোটি)। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৪ কোটিতে। অর্থাৎ, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর (তরুণ) ওপর নির্ভরশীল বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৬২ দশমিক ১ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১০ কোটি ২৬ লাখ মানুষ কর্মক্ষম বয়সসীমায় রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই বেকারত্বের হার ২৮ শতাংশের বেশি, যা শ্রমবাজার ও শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা যুগান্তরকে বলছেন, তরুণদের হাতে রয়েছে পৃথিবী পরিবর্তনের হাতিয়ার। তাদের জন্মদানে সক্ষমতা বেশি। তরুণরা দেশকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাতে পারে। কিন্তু নগরায়ণ, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে অনেকে ক্যারিয়ার গঠনের দিকে ঝুঁকছেন। অনেক নারী সন্তান ধারণ এমনকি বিয়েতে পর্যন্ত আগ্রহ হারাচ্ছে। বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে একা থাকার প্রবণতা বাড়ছে। শিক্ষার ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি, কাজের সন্ধানে দেশ ত্যাগ, ভোগবাদিতাসহ নানা কারণে তরুণ নারী-পুরুষদের জীবনযাত্রা কঠিন হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু এ খাতে নজর দেওয়া হচ্ছে না। মাঠকর্মীদের জন্ম নিয়ন্ত্রণের কাজ করার জন্য যে সাপোর্ট দেওয়ার কথা, তা সঠিকভাবে হচ্ছে না। সরকারিভাবে বিতরণ করা জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পাঁচ ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণের সরবরাহ প্রায় ৭৮ শতাংশ কমে গেছে। দেড় বছর ধরে এমন সংকট চলছে।

এতে সামান্য জন্মহার বাড়লেও সার্বিক বিচারে দেশে গত পাঁচ দশক ধরে এ হার কমছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং স্যাটেলাইট ক্লিনিকে সাধারণত কনডম, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, ইনজেকশন, ইমপ্ল্যান্টসহ বিভিন্ন পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা যুগান্তরকে বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সাময়িক ঘাটতি থাকলেও তা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে সরকার কাজ করছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মূল্যায়ন শেষ হলে সারা দেশে আগামী ১৫ মাসের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রায় ৩৯ হাজার কর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে সক্ষম দম্পতি নিবন্ধন, বিনামূল্যে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি বিতরণ, গর্ভবতী মায়েদের সেবা এবং কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ বেল্লাল হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী থাকলেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা পাওয়া যায় না; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। ২০৩৩ সালে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড শেষ হয়ে যাবে। এজন্য স্বাস্থ্য ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়নে এখনই বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, তরুণরা যখন বিবাহ করে সংসার জীবনে প্রবেশ করছে তখনই তাদের স্বপ্ন দেখাতে হবে পরিবার সমাজ ও দেশ নিয়ে। তরুণ সমাজকে হাতিয়ার হিসাবে ধরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিকে নিয়ন্ত্রণ করার যে পরিকল্পনা তা তৈরি করতে হবে। এ বছর বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষ্যে কাল রোববার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক সভা অনুষ্ঠিত হবে। দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও প্রাইভেট চ্যানেলগুলো বিশেষ কর্মসূচি সম্প্রচার এবং বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে।