চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে ছয়টি সংযোগ সড়ক পাকাকরণ প্রকল্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এলাকাটি দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কাজ দ্রুত ও কার্যকরভাবে শেষ করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সেই সঙ্গে ইউরিয়া, ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) ও টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) সার উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল জরুরিভিত্তিতে সংগ্রহের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের সময়সীমা ৪২ দিনের পরিবর্তে ২১ দিন নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সরকার। এছাড়া দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) বিভিন্ন দেশের ১৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এসব প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদন চাওয়া হতে পারে। বুধবার (২২ জুলাই) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
আরও পড়ুন
জঙ্গল সলিমপুরে সড়ক নির্মাণ শুরু সেনাবাহিনীর
জঙ্গল সলিমপুরে সংযোগ সড়ক পাকাকরণ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে জঙ্গল সলিমপুর এলাকার ছয়টি সংযোগ সড়ক পাকাকরণ প্রকল্পের প্রস্তাবিত দ্বিতীয় সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড, চট্টগ্রামকে নির্বাহক সংস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির নীতিগত অনুমোদন চাওয়া হতে পারে।
অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রস্তাবটি অনুমোদন দিলে সেনাবাহিনী প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে থাকছে এবং সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ‘চট্টগ্রাম বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ২০ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়। প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় তিন হাজার ১১০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় জঙ্গল সলিমপুর এলাকার ছয়টি সংযোগ সড়ক পাকাকরণের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
দেশে সারের কোনো সংকট নেই: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
স্থানীয় সরকার বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে সড়ক নির্মাণকাজ দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড, চট্টগ্রামের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রস্তাবটি অনুমোদন দিলে পরবর্তী কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।
সারের কাঁচামাল আমদানির দরপত্রের সময় কমছে
এছাড়া, বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপি সার উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল জরুরিভিত্তিতে সংগ্রহের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের সময়সীমা ৪২ দিনের পরিবর্তে ২১ দিন নির্ধারণের নীতিগত অনুমোদন চাওয়া হতে পারে। মন্ত্রিসভা কমিটি প্রস্তাবটি অনুমোদন দিলে দরপত্র আহ্বানের সময়সীমা কমে অর্ধেকে চলে আসবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ডিএপি ও টিএসপি সার উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল ফসফরিক এসিড, রক ফসফেট ও সালফার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপি সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল হিসেবে দুই লাখ পাঁচ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ফসফরিক এসিড, ৯০ হাজার মেট্রিক টন রক ফসফেট, ১৫ হাজার মেট্রিক টন ব্রাইট ইয়েলো সালফার ও ১৮ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া ফরমালডিহাইড আমদানি করা প্রয়োজন।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে সড়ক নির্মাণকাজ দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড, চট্টগ্রামের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।- স্থানীয় সরকার বিভাগের এক কর্মকর্তা
এসব কাঁচামাল কেনার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের পর থেকে দরপত্র খোলার জন্য ৪২ দিন সময় নির্ধারিত রয়েছে। তবে এই দীর্ঘ সময়সীমা অনুসরণ করলে আন্তর্জাতিক বাজারের অনুকূল সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।
তাছাড়া বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ অবস্থায় ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপি সার উৎপাদনের কাঁচামালের ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা কমিয়ে ২১ দিন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তাই সারের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং কৃষিখাতে প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের সময়সীমা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়।
আরও পড়ুন
রাশিয়া ও কানাডা থেকে কেনা হচ্ছে ৩৫১ কোটি টাকার সার
দরপত্র ছাড়াই ১৬ লাখ টন ডিজেল আমদানি
এদিকে দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) বিভিন্ন দেশের ১৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১৫ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। ১৭ হাজার ৪৭২ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার টাকা সম্ভাব্য ব্যয় ধরে এই ডিজেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে চাওয়া হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাবে এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বাস্তবায়নে এসব ডিজেল আমদানি করা হবে। ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, ওমানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এনার্জি মাল্টিনেক্স কনভারেন্স টেকনোলজিস এলএলসির কাছ থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এজন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৬৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
আরও পড়ুন
অর্থ সংকটে নাজেহাল বিপিসি
সেই সঙ্গে নাইজেরিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক সিলভারলাইন লিমিটেডের কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন ৫০-পিপিএম ডিজেল এক হাজার ২২৫ কোটি ৪৭ লাখ ৩০ হাজার টাকায়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান একে এনার্জি লিমিটেডের কাছ থেকে এক লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল এক হাজার ১৭০ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় ও অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টোটাল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল এক হাজার ২৮৩ কোটি ৩১ লাখ ৯০ হাজার টাকায় আমদানির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এছাড়া সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সিটিজামান ইন্টারন্যাশনাল পিটিই লিমিটেডের কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল এক হাজার ২৬১ কোটি ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকায়, সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এইটিন সলিউশনস এসডিএন বিএইচডির কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল এক হাজার ২৬৮ কোটি ৭৬ লাখ ১০ হাজার টাকায় ও ডেনমার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইমপোর্টাসিওনেস ব্রাভো গ্রুপ-চিলি এসপিএ’র কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল এক হাজার ৯৭ কোটি ৭৪ লাখ ৪০ হাজার টাকায় আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দিলে এই ডিজেল আমদানির পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।- জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রয়্যাল বাবজি ফুয়েল ট্রেডিং এলএলসির কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন ৫০ পিপিএম ডিজেল এক হাজার ২৮১ কোটি ৬৭ লাখ ৩০ হাজার টাকায়, হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সিনোপ্রাউড ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন লিমিটেডের কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল এক হাজার ১১ কোটি ৯৯ লাখ টাকায় ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হেলথ আইকন ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিংস পিটিই লিমিটেডের কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল ৯৩৬ কোটি ৫৩ লাখ ৪০ হাজার টাকায় আমদানি করা হবে।
এছাড়া, কাজাখস্তানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কুমারাঙ্গাজি অয়েল ফিল্ড থেকে এক লাখ মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল ৯৩৬ কোটি ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকায়, একই দেশের প্রতিষ্ঠান এইচটুয়েন্টি পেট্রো-কেম ইন্টারন্যাশনাল পিটিই লিমিটেডের থেকে এক লাখ মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল এক হাজার ২৯০ কোটি ৩৫ লাখ ৯০ হাজার টাকায় ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এইচটুয়েন্টি কনস্ট্রাকশন পিটিই লিমিটেড থেকে এক লাখ মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল এক হাজার ৩৯৭ কোটি ৭২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় আমদানি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
জ্বালানি তেলের দাম বাধ্য হয়ে বাড়ানো হয়েছে: প্রতিমন্ত্রী
পাশাপাশি দুবাইভিত্তিক ব্ল্যাক সোয়ান গ্লোবাল এফজেডসিও থেকে এক লাখ মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল এক হাজার ২৪৬ কোটি ৬৫ লাখ ৭০ হাজার টাকায় এবং স্পেনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওকেরিয়েল করপোরেশন থেকে এক লাখ মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল এক হাজার ৪০০ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় আমদানি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, ডিজেল আমদানির সম্ভাব্য যে মূল্য ধরা হয়েছে, তাই চূড়ান্ত না। আমদানির সময় প্রকৃত মূল্য কম বা বেশি হতে পারে। কারণ এই ডিজেলের মূল্য বিল অব লেডিং তারিখে প্রকাশিত মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা প্ল্যাটস প্রকাশনা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকাশিত মূল্য এবং বিনিময় হারের ওঠানামার কারণে প্রকৃত মূল্য কম বা বেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দিলে এই ডিজেল আমদানির পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এমএএস/একিউএফ







