একেবারে অন্তিম মুহূর্তে মার্তিনেল্লির ম্যাজিকে জয়সূচক গোল পাওয়ার পর ব্রাজিলের ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার কয়েক ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ও মেক্সিকোর মন্তেরেতে দুবার ‘ভূমিকম্প’ হলো। বাংলাদেশ যখন ঘুমিয়ে তখনই এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটালো ভূমিবেষ্টিত দক্ষিণ আমেরিকার দুটি ভাষাভাষির দেশ প্যারাগুয়ে। চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা প্যারাগুয়ে চলে গেল শেষ ষোলোতে। সেখানে তাদের সাক্ষাৎ হতে পারে ফ্রান্স অথবা সুইডেনের সঙ্গে। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি জার্মানির পতনে বোদ্ধারা বিস্মিত। সাবেকরা ক্ষুব্ধ। টনি ক্রুস যেমন বলেছেন, ‘এই জার্মানি সেই জার্মানি নয়, যাকে আমরা চিনতাম।’

নেদারল্যান্ডসও সেই নেদারল্যান্ডস নয়, যারা ‘টোটাল ফুটবল’ এর জনক। ইয়োহান ক্রুয়েফ দূর আকাশ থেকে এই ম্যাচটা দেখে থাকলে, নিশ্চয় তার চোখ ভিজেছে। ওলন্দাজদের সোনালি প্রজন্মের পরবর্তী দুই প্রতিনিধি রুড খুলিত ও ফ্র্যাংক রাইকার্ডও অনুচ্চারিত আক্ষেপে পুড়েছেন। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে যদিও একধাপ উপরে থাকা মরক্কোর (৬) কাছে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে ডাচদের (৭) হারকে অঘটন বলা যাবে না, তবু ভার্জিল ফন ডাইকদের দ্বিতীয় রাউন্ডেই থেমে যাওয়ায় বিশ্বকাপের আকর্ষণ অনেকাংশে কমে গেল। প্রথমে জার্মানি, এরপর নেদারল্যান্ডস-দুদলের বিদায়ে বিশ্বকাপ অনেকটা ‘সর্বহারা’ হতে চলেছে।

জার্মানির পতন!

২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে ‘সেভেন আপ’ দুঃস্বপ্ন উপহার দেওয়ার পর ফাইনালে আরেক লাতিন পরাশক্তি আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল জার্মানি। এক যুগ পর সেই লাতিনদের হাতেই জার্মান দুর্গের পতন ঘটল। গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথম অঘটনের জন্ম দিয়েছিল ইকুয়েডর। সেই খুশিতে লাতিন দেশটিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এক সপ্তাহ পর বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা অঘটন উদ্যাপন করতে মঙ্গলবার প্যারাগুয়েতেও ঘোষণা করা হয় সাধারণ ছুটি। গত পরশু রাতে বোস্টনে নিজেদের সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে জার্মান-বধের মহাকাব্য লিখেছে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা লাতিন দেশটি। টাইব্রেকারে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোতে ওঠা প্যারাগুয়ের জন্য স্বপ্নপূরণের চেয়েও বেশি কিছু।

নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে জার্মানির দুটি শট ঠেকিয়ে প্যারাগুয়ের নায়ক গোলকিপার অরলান্দো গিল। এর আগে মূল ম্যাচেও তিনি ছয়টি সেভ করেন। বিশ্বকাপে পাঁচবার টাইব্রেকারে গিয়ে এই প্রথম হারল জার্মানি।

এর আগে ৪২ মিনিটে হুলিও এনসিসোর গোলে পিছিয়ে পড়া জার্মানিকে ৫৪ মিনিটে সমতায় ফেরান কাই হাভার্টজ। এরপর জার্মানরা আক্রমণের ধার বাড়ালেও প্যারাগুয়ের রক্ষণ হয়ে যায় চীনের প্রাচীর। অতিরিক্ত সময়ে সেই প্রাচীর ভেঙে জনাথন টাহ হেডে প্যারাগুয়ের জাল কাঁপালেও ফাউলের দায়ে ভিএআরে বাতিল হয়ে যায় সেই গোল। এরপর টাইব্রেকারে দুদলের পাঁচটি করে শটও শেষ হয় ৩-৩ সমতায়। হাভার্টজ ও ভোল্টেমাডের শট ঠেকিয়ে দেন গিল। প্যারাগুয়ের দুজনও ব্যর্থ হন লক্ষ্যভেদে। এরপর সাডেন ডেথে জার্মানির টাহ বল উড়িয়ে মারলেও মিস করেননি প্যারাগুয়ের হোসে কানালে। তাতেই নিশ্চিত হয় শেষ বত্রিশ থেকে জার্মানির বিদায়। গত দুই আসরে তারা বিদায় নিয়েছিল গ্রুপপর্ব থেকে।

এমন ধারাবাহিক ব্যর্থতাকে জার্মান ফুটবলের চূড়ান্ত পতন হিসাবে দেখা হচ্ছে। বাস্তবতা মেনে নিলেন কোচ ইউলিয়ান নাগলসমান, ‘এখন আমরা আর প্রথম সারির দল নই।’

আটলাসের সিংহদের গর্জন : ২০২২ বিশ্বকাপে প্রথম আরব-আফ্রিকান দেশ হিসাবে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছিল মরক্কো। আটলাসের সিংহদের গর্জনে কাঁপছে ২০২৬ বিশ্বকাপও। গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে রুখে দেওয়ার পর নকআউটের শুরুতে তিনবারের রানার্সআপ নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোয় উঠেছে মরক্কো। মঙ্গলবার সকালে মেক্সিকোর মন্তেরে স্টেডিয়ামে মহানাটকীয় টাইব্রেকারের আগে ১২০ মিনিটের স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই শেষ হয়েছিল ১-১ সমতায়। অনাগত সন্তান হারানোর শোক সঙ্গী করে খেলতে নামা লিভারপুল তারকা কোডি গাকপোর গোলে ৭২ মিনিটে এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। গোলের পর আবেগতাড়িত হয়ে পড়া গাকপো হতে পারতেন ডাচদের জয়ের নায়ক। ৯০ মিনিট শেষেও পিছিয়ে থাকা মরক্কো পৌঁছে গিয়েছিল বিদায়ের দুয়ারে। কিন্তু ভাগ্য ভেবে রেখেছিল অন্য কিছু। যোগ করা সময়ে হেডে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোলে ডাচদের স্তব্ধ করে দেন বয়সভিত্তিক ফুটবলে ফ্রান্সের হয়ে খেলা মরক্কোর ডিফেন্ডার ইসা দিওপ।

অতিরিক্ত সময়ে আর গোল না হওয়ায় খেলা গড়ায় স্নায়ুক্ষয়ী টাইব্রেকারে। সেখানে দুদলের ভুলের মহড়ায় ১০ শটের মাত্র পাঁচটি খুঁজে পায় জালের ঠিকানা। বেশি ভুল করায় কপাল পোড়ে নেদারল্যান্ডসের। তিনটি শট মিস করে ডাচরা। দুটি শট লাগে পোস্টে, একটি রুখে দেন মরক্কোর গোলকিপার ইয়াসিন বুনু। মরক্কোর দুজনও পোস্ট কাঁপান। শেষ পর্যন্ত শেষ শটে লক্ষ্যভেদ করে মরক্কোকে দারুণ জয় এনে দেন ইসমায়েল সাইবারি।

এ নিয়ে রেকর্ড চতুর্থবার বিশ্বকাপে টাইব্রেকারে হারল নেদারল্যান্ডস। আবারও কমলা হলো বিষাদের রং। স্নায়ুচাপের পরীক্ষায় জিতে মরক্কো অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি বলেন, ‘আমাদের এমন ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা আছে। জানতাম, কাদের সঙ্গে খেলছি। তাই মনোযোগ ধরে রাখার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী থাকতে হয়েছে। বিশ্বাস ছিল বলেই আমরা জিতেছি। দারুণ সমর্থনের জন্য মেক্সিকোকে ধন্যবাদ।’