২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উত্থাপিত নির্দিষ্টকরণ বিল ২০২৬ পাসের মধ্য দিয়ে বাজেট পাসের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। নতুন অর্থবছরের শুরুর দিন আজ ১ জুলাই থেকে এ বাজেট কার্যকর হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির সম্মতিসাপেক্ষে নির্দিষ্টকরণ আইন গেজেট আকারে প্রকাশিত হবে।
গতকাল সোমবার রাতে শুরু হওয়া বাজেট পাসের প্রক্রিয়ায় মন্ত্রীরা তাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যয় নির্বাহের যৌক্তিকতা তুলে ধরে মোট ৫৯টি মঞ্জুরি দাবি সংসদে উত্থাপন করেন। এই মঞ্জুরি দাবিগুলো সংসদে কণ্ঠভোটে নিষ্পত্তি হয়। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদের বৈঠকে এই বাজেট কণ্ঠভোটে পাস হয়।
এ ছাড়া মঞ্জুরি দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে বিরোধী দলের ৪৩ জন সংসদ সদস্য এক হাজার ৩৪৩টি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ৫৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মঞ্জুরি দাবির মধ্যে ৩৬ টির ওপর আলোচনার সিদ্ধান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।
জাতীয় সংসদে ১১ জুন ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শীর্ষক ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ৫৫ তম ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরুর প্রথম বাজেট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে এবারের বাজেটের আকার বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা (১৮.৭৩ %)। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি। অবশ্য সংশোধিত বাজেটে এটি কমে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটিতে দাঁড়ায়।
বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংসদে উপস্থাপনের পর অধিবেশনজুড়ে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনা করেন সংসদ সদস্যরা। বিরোধী দলের সদস্যরা নতুন বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে সমালোচনা করেন। ১১ দিন আলোচনা শেষে সোমবার রাতে সংসদে অর্থ বিল–২০২৬ পাস হয়।
জোহরের নামাজের বিরতির পর ৩৩ নম্বর ছাঁটাই প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান ফ্লোর নিয়ে সংসদের সময় বাঁচাতে প্যাকেজ আকারে ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো প্রত্যাহার করে নেন। তিনি বলেন, আমরা বিরোধী দলের পক্ষ থেকেই মূলত প্রস্তাবগুলো দিয়েছি। এটা একটা রেওয়াজ, রেওয়াজের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি এবং আলোচনা গ্রহণ হওয়ার সম্ভাবনা নাই, সেই কারণে আমরা মূল্যবান সময়টা বাঁচাতে পারি কি না, আমাদের কোনো সুযোগ আছে কি না, ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো আমরা প্যাকেজ প্রত্যাহার করে নিলাম তাহলে বোধ হয় কাজটা সহজ হয়।
এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ধন্যবাদ বিরোধী দলীয় নেতা আমার মনে হয় ট্রেজারি বেঞ্চ আপনার এ প্রস্তাব তারা গ্রহণ করেছে, আমার মনে হয় প্রস্তাবগুলো উত্থাপনে মাননীয় মন্ত্রী প্রস্তাব উত্থাপনের পর সরাসরি প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া হবে, ধন্যবাদ বিরোধীয় দলীয় নেতা, অনেক সময় বাঁচবে। পরের ২৫টি মঞ্জুরি দাবি সরাসরি ভোটে দেওয়া হয়। এ দিয়ে যেসব মঞ্জরি দাবি নিয়ে আলোচনা হয় সেখানে প্রতিটির ওপর সর্বোচ্চ জন সদস্যকে আলোচনা করতে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব দাবি কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।
সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরুসহ সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
এবারের বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে।
অভ্যন্তরীণ উৎসের বড় অংশই আসবে ব্যাংকিং খাত হতে। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) আগেই অনুমোদিত হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বর্তমানের চেয়ে ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। সোমবার বাজেট বক্তৃতার সময়ে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে তা আরও বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হয়। আয়সীমা ২০২৭-২৮ অর্থ বছরেও চার লাখ টাকা বলবৎ থাকবে।
একইভাবে নারী, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণদের করমুক্তসীমাও পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হয়েছে। ব্যক্তি আয়সীমা বৃদ্ধি ছাড়াও তিন ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বাদ দেওয়া এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন খাতে নতুন কর ও ভ্যাট ছাড়যুক্ত করাসহ ৬৪টি সংশোধনী যুক্ত করে সংসদে অর্থবিল পাস হয়।
বাজেট প্রস্তাবের সময়ে করের আওতা বাড়াতে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ওপর দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপের কথা হলেও সমালোচনার মুখে এটি বাদ দিয়ে ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট আদায়ের কথা বলা হয়। প্রস্তাবে কাঁচা বাজার ও ক্ষুদ্র মুদিদোকানও করের আওতাভুক্ত করা হলেও এটি বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।








