২০০৬ সালের ১১ জুলাই। পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে বাসে চড়ে জয়পুরহাটে যাচ্ছিলেন ২২ বছরের মাছুম হুদা। মাত্র তিন মাস আগে বিয়ে করেছেন তিনি। মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। সেজন্যই পাসপোর্টের কাজ নিয়ে ব্যস্ততা ছিল তাঁর। কিন্তু বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার যেতেই থেমে যায় তাঁর জীবনের সব পরিকল্পনা। সেদিন সকাল ১০টা ২২ মিনিটের দিকে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার আমুট্ট রেলক্রসিংয়ে যাত্রীবাহী খেয়া পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে আন্তনগর রুপসা এক্সপ্রেস ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন মাছুম। দুর্ঘটনায় টানা এক সপ্তাহ ছিলেন সংজ্ঞাহীন। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে আবিষ্কার করেন হাসপাতালের বিছানায়।
এখন মাছুম হুদার বয়স ৪২ বছর। মালয়েশিয়া আর যাওয়া হয়নি। আক্কেলপুর পৌর শহরে মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশের ব্যবসা করেন তিনি। কিন্তু ২০ বছর আগের সেই ভয়াবহ ট্রেন-বাস দুর্ঘটনার স্মৃতি আজও তাঁকে তাড়া করে ফেরে।
সেদিনের সেই বাস-ট্রেনের সংঘর্ষের দুই দশক কাল শনিবার পূর্ণ হবে। সেদিনের দুর্ঘটনায় অন্তত ৪০ জন নিহত এবং আরও অন্তত ৩৮ জন আহত হন। তবে এত বছর পরও নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে প্রতিশ্রুত স্মৃতিফলক নির্মাণ হয়নি।
দুর্ঘটনার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করেছিলেন। স্থানীয়ভাবে তিন দিনের শোক পালন করা হয়। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে সরকারি আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছিল। সে সময় আক্কেলপুর পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রতিবছর শোক দিবস পালন এবং দুর্ঘটনাস্থলে স্মৃতিফলক নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সেই ঘোষণা বাস্তবায়ন হয়নি।
সেদিনের কথা স্মরণ করে মাছুম হুদা বলেন, ২০০৬ সালে আমার বয়স ছিল ২২ বছর। তিন মাস আগে বিয়ে করেছি। মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন ছিল। জয়পুরহাটে পাসপোর্ট করতে দিয়েছিলাম। সেদিন সকালে পাসপোর্ট আনতে খেয়া পরিবহনের একটি বাসে করে জয়পুরহাট যাচ্ছিলাম। বাসে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। আমুট্ট রেলগেটে পৌঁছানোর পর যাত্রীদের চিৎকার শুনেছিলাম। এরপর আর কিছু মনে নেই। এক সপ্তাহ পর হাসপাতালে জ্ঞান ফিরল। তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় আমার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। বাংলাদেশ ও ভারতে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয়েছে। চিকিৎসায় প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এখনো সেই দুর্ঘটনার ক্ষত শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছি।
ওই দুর্ঘটনায় আক্কেলপুর পৌর এলাকার শান্তা গ্রামের এক বাবা ও তাঁর দুই ছেলে নিহত হন। নিহত ব্যক্তিদের স্বজন মোর্শেদ বলেন, ওই বাসে আমার বাবা ও দুই ভাই জয়পুরহাট যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনায় তিনজনই মারা যান। ২০ বছর ধরে আমরা একই সঙ্গে বাবা ও দুই ভাইকে হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছি। দুর্ঘটনার পর সেখানে স্থায়ী গেট ও গেটম্যান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আজও নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে কোনো স্মৃতিফলক নির্মাণ হয়নি।
আক্কেলপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও আক্কেলপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র কামরুজ্জামান কমল বলেন, এটি ছিল দেশের স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ ট্রেন-বাস দুর্ঘটনা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন। গত বছর তৎকালীন ইউএনও মনজুরুল আলম দুর্ঘটনাস্থলে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বদলি হওয়ার পর সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি।
আক্কেলপুর রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার হাসিবুল আলম বলেন, দুর্ঘটনার সময় রেলক্রসিংটি অরক্ষিত ছিল। সেখানে কোনো গেটম্যানও ছিলেন না। দুর্ঘটনার পর স্থায়ী গেট নির্মাণ করা হয়েছে। এখন ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে গেটম্যান দায়িত্ব পালন করেন। ফলে রেলক্রসিং দিয়ে যানবাহন ও মানুষের চলাচল আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ হয়েছে।








