বাংলাদেশ যেবার শেষ অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে গিয়েছিল, তখন অসি বিশেষজ্ঞরা ফোড়ন কেটে বলেছিলেন, বাংলাদেশের করুণ পরিণতি ঘটবে। টাইগাররা দুই দিনেই টেস্ট হারবে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তা হয়নি। খালেদ মাসুদ পাইলটের নেতৃত্বে টিম বাংলাদেশ দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ ২-০ ব্যবধানে হারলেও অত করুণ পরিণতি ঘটেনি।
দীর্ঘ ২৩ বছর পর আবার অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজে অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী আগস্টে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ শুরু হবে নাজমুল হোসেন শান্তর দলের। ওই সিরিজে কী হবে?
এবার সত্যি সত্যিই দুই দিনেই হেরে বসবে না তো টাইগাররা? ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া যে ভয়ঙ্কর এক দল! টেস্ট র্যাংকিংয়ের ওপরের দিকের দলগুলোও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে হিমশিম খায়, যাচ্ছেতাইভাবে হারে। সেখানে জিম্বাবুয়ের মতো টেস্ট র্যাংকিংয়ের সবচেয়ে নিচের দলের কাছে আড়াই দিনে ইনিংসে হেরে বসা বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়ায় কী হবে? সে শঙ্কায় বুক কাঁপছে অতি বড় বাংলাদেশ সমর্থকেরও।
এটা সত্যি, পরপর চারটি সিরিজ জিতেছে টিম বাংলাদেশ। তার সবগুলো যে দেশের মাটিতে, তাও না। এতগুলো সিরিজ টানা ভালো খেলার পর একটি ম্যাচে পারফরম্যান্স খারাপ হতেই পারে; কিন্তু সেটা জিম্বাবুয়ের মতো দুর্বল দলের সঙ্গে কেন হবে?
হারারও একটা ধরণ আছে; কিন্তু জিম্বাবুয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ আজ ৩০ জুন যেভাবে টেস্ট হারল, তা অতীতের সব খারাপ খেলা আর করুণ পরিণতিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এবার শান্তর দল যতটা বাজেভাবে হেরেছে, পারফরম্যান্স যত অনুজ্জ্বল আর শ্রী-হীন ছিল, জিম্বাবুয়ে যখন এর চেয়ে ঢের সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী ছিল, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্রান্ট ফ্লাওয়ার, গাই হুইটল, অ্যান্ডি ব্লিগনট, অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেল, স্টুয়ার্ট কার্লাইল, হিথ স্ট্রিকরা যখন খেলতেন, তখনও বাংলাদেশ এত খারাপভাবে হারেনি।
জিম্বাবুয়ের প্রথম ইনিংসে ৪১০ রানের জবাবে বাংলাদেশ হেরেছে ইনিংস ও ৮৫ রানে। প্রথম ইনিংসে ১৪০ রানে অলআউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে শান্তর দল করেছে ১৮৫। জিম্বাবুয়েও যদি দুই-আড়াইশ রানে ইনিংস শেষ করত, তাও সান্ত্বনা খোঁজা যেত। কিন্তু তা আর হলো কই?
তবুও রক্ষা, তাইজুল দেশের বাইরে নিজের সেরা বোলিং স্পেল (৭/১৩৮) উপহার দিয়ে জিম্বাবুয়ের মিডল ও লেট অর্ডারের লেজ মুড়িয়ে দিয়েছেন। না হলে জিম্বাবুয়ের স্কোর হয়তো সাড়ে পাঁচশ ছাড়িয়ে যেত।
একজন ব্যাটারের ব্যাটিং দেখেও মনে হয়নি তারা দেশের বাইরে ভালো খেলতে পারেন। সাদমান, মাহমুদুল হাসান জয়, অভিষেক হওয়া তাওহিদ হৃদয় আর অমিত হাসানের ব্যাটিং দেখে মনে হয়নি, দেশের বাইরে টেস্ট খেলার জন্য তারা পুরোপুরি প্রস্তুত।
উইকেট বোলারদের স্বর্গ হলে একটা কথা ছিল; কিন্তু তা তো নয়। স্পোর্টিং পিচ। বল ঠিকমতো ব্যাটে এসেছে। বাউন্সটাও ছিল ভালো। জিম্বাবুয়ের ফাস্ট বোলাররা খুব ভালো জানেন, এই উইকেটে কোন লাইন ও লেন্থে বল করলে বাংলাদেশের ব্যাটারদের স্বচ্ছন্দে খেলা কঠিন হবে। তারা তাই করেছেন। নিউম্যান নিয়ামহুরি এবং মুজারাবানির পেস বোলিং খেলতে নাভিঃশ্বাস উঠেছে টাইগার ব্যাটারদের।
এই স্পোর্টিং পিচে জিম্বাবুয়ের বোলারদের সামলাতে না পারা শুধু ব্যর্থতাই নয়, চরম দৃষ্টিকটুও। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে করুণ পরিণতির শঙ্কাও। হয়তো কেউ কেউ বলবেন, টানা চার টেস্ট জয়ের পর একটি টেস্ট হেরেছে তো কী হয়েছে? তাদের জন্য বলা, তাই বলে এতটা বাজেভাবে?
এই শ্রী-হীন আর অনুজ্জ্বল ব্যাটিংয়ের ব্যাখ্যা কী? এমন খাপছাড়া ও গা-ছাড়া দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংয়ের আসলে কোনো ব্যাখ্যা নেই। বোঝাই গেছে, প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ের বোলিং ও ব্যাটিং শক্তি সম্পর্কে তেমন পরিষ্কার ধারণা না নিয়েই মাঠে নেমেছে শান্তর দল।
এই দল যে ঠিক আগের টেস্টে আফগানিস্তানকে হারিয়েছে, সে চিন্তাটাও হয়তো মাথায় ছিল না। থাকলে শরীরী ভাষায় এতটা গা-ছাড়া ভাব চোখে পড়ত না। খেলাটা পাঁচ দিনের। প্রতিপক্ষের বোলার ও ব্যাটারদের নামডাক কম থাকতে পারে। কিন্তু তারাও টেস্ট ক্রিকেট খেলতে জানে। পাঁচ দিন খেলতে হলে কী কী করণীয়, তা জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটারদের ভালোই জানা।
পারফরম্যান্স দেখে মনে হয়েছে, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মনে সে ভাবনাটাও ছিল না। ভাবটা ছিল এমন- ‘আরে, হাতি-ঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল?’ আমরা পাকিস্তান, আয়ারল্যান্ড আর শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েছি, জিম্বাবুয়ে কোন ছার? এই ভাবনাটাই যে কাল হয়েছে।
চিন্তা-ভাবনা যাই থাকুক, অ্যাপ্রোচ ও অ্যাপ্লিকেশন যত বিশ্রী, হতশ্রীই থাকুক না কেন, জিম্বাবুয়ের সঙ্গে এ করুণ পরিণতি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আগামী এক মাস পরের টেস্ট সিরিজের জন্য এক বিরাট সতর্কবার্তা। এ সিরিজে দুটি কঠিন সত্য ফুটে উঠেছে। এক, দেশের বাইরে দ্রুতগতির স্পোর্টিং পিচে ব্যাটিং ও বোলিং- দুই বিভাগেই দুর্বলতা, ঘাটতি ও কমতি আছে।
ব্যাটাররা বল একটু দ্রুত, খানিকটা লাফিয়ে এবং সামান্য মুভ করলেই বিব্রত বোধ করেন। আর বোলাররা, বিশেষ করে পেসাররা, এমন কন্ডিশনে ঠিক কোন লাইন ও লেন্থে বল করলে সফল হওয়া যাবে, তা বুঝে উঠতে অনেক বেশি সময় নিয়ে ফেলেন।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অসিদের বিপক্ষে এমন পিচে তাই সমস্যা হতে পারে। হারারে স্পোর্টস ক্লাবের এই করুণ পরিণতি থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং এ টেস্টে করা ভুল-ত্রুটি শুধরে ওঠার প্রাণপণ চেষ্টাই হবে করণীয় কাজ। না হলে আরও করুণ পরিণতি ঘটতে পারে।
এআরবি/আইএইচএস








