বিশ্বকাপের জয়যাত্রায় ব্রাজিলবধ করে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকারদের একজন হয়ে উঠেছেন আর্লিং হলান্ড। মনে হচ্ছে, 'রু রু' করতে করতে এবার শিরোপা জিতে নেবে নরওয়ের নৌকা। আর এর মূল কারণ হলো, হলান্ডের অসাধারণ শারীরিক শক্তি ও বিস্ফোরণধর্মী গতির বিরল সমন্বয়।

'রু রু' করতে করতে এবার শিরোপা জিতে নেবে নরওয়ের নৌকা? আর সেই জয়যাত্রায় ব্রাজিলবধ করে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকারদের একজন হয়ে উঠেছেন আর্লিং হলান্ড। এর মূল কারণ হলো, তাঁর অসাধারণ শারীরিক শক্তি ও বিস্ফোরণধর্মী গতির বিরল সমন্বয়।

'রু রু' করতে করতে এবার শিরোপা জিতে নেবে নরওয়ের নৌকা?

১.৯৫ মিটার (৬ ফুট ৫ ইঞ্চি) উচ্চতার এই নরওয়েজিয়ান ফরোয়ার্ডের দেহগঠন দানবিক। সেই সঙ্গে তিনি দৌড়ান বিশ্বের সেরা স্প্রিন্টারদের গতিতে। আকার, শক্তি ও গতির এই বিরল সংমিশ্রণ তাঁকে এমনভাবে ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করতে সাহায্য করে, যা খুব কম খেলোয়াড়ই করতে পেরেছেন ফুটবলের ইতিহাসে। তাঁর শারীরিক সক্ষমতা শুধু দর্শকদের মুগ্ধই করে না, বরং ম্যাচের প্রায় প্রতিটি মুহূর্তে তিনি সেগুলো অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজে লাগান।

১. বিস্ফোরক অ্যাক্সেলারেশন

হলান্ড লম্বা ও শক্তিশালী গড়নের খেলোয়াড় হলেও পেটিট খেলোয়াড়দের মতো প্রথম কয়েক মিটারে তার গতি তোলার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা তাঁকে আরেক ধরনের আপার হ্যান্ড দেয়। এই ব্যপাটি তিনি কয়েকভাবে কাজে লাগান ফুটবলে।

থ্রু বলের দৌড়ে ডিফেন্ডারদের হারিয়ে দিতে পারেন।

প্রতিপক্ষ প্রতিক্রিয়া জানানোর আগেই খালি জায়গায় ঢুকে পড়েন।

অর্ধেক সুযোগকেও নিশ্চিত গোলের সুযোগে পরিণত করেন।

দ্রুতগতির খেলোয়াড়দের সহজেই দূরত্ব তৈরি করে ফেলেন।

হালান্ডের অনেক গোলের সূচনা হয় এমন এক আকস্মিক স্প্রিন্ট দিয়ে, যা ডিফেন্ডারদের পুরোপুরি অপ্রস্তুত করে দেয়।

প্রথম কয়েক মিটারে তার গতি তোলার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা তাঁকে আরেক ধরনের আপার হ্যান্ড দেয়

২. অবিশ্বাস্য স্প্রিন্টিং গতি

প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে হলান্ডের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩৬ কিলোমিটারেরও বেশি রেকর্ড করা হয়েছে, যা তাকে বিশ্বের দ্রুততম ফুটবলারদের কাতারে স্থান দিয়েছে।

হলান্ডের এই গতি তাকে সাহায্য করে কয়েকভাবে। যেমন

বিধ্বংসী পাল্টা আক্রমণের নেতৃত্ব দিতে।

প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ছড়িয়ে দিতে।

ডিফেন্ডারদের পিছিয়ে যেতে বাধ্য করতে, ফলে সতীর্থদের জন্য আরও বেশি জায়গা তৈরি হয়।

এমন সব লুজ বলের দখল নিতে, যেগুলোর জন্য অধিকাংশ স্ট্রাইকার লড়াইই করতেন না।

৩. সত্যিকার অর্থে গায়ের জোরে আধিপত্য

হালান্ড ম্যাচজুড়ে একের পর এক শারীরিক দ্বৈরথে জয়ী হতে তাঁর অসাধারণ শক্তিকে কাজে লাগান। এই শক্তির মাধ্যমে তিনি সতীর্থদের সহায়তা আসা পর্যন্ত বল আড়াল করে রাখেন, একাধিক ডিফেন্ডারের চাপ সামলান, কঠিন ট্যাকলের মুখেও ভারসাম্য বা ব্যালেন্স বজায় রাখেন। একবার ভালো অবস্থান নিয়ে ফেললে তাঁর শক্তির কারণে ডিফেন্ডারদের পক্ষে হলান্ডের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

হালান্ড ম্যাচজুড়ে একের পর এক শারীরিক দ্বৈরথে জয়ী হতে তাঁর অসাধারণ শক্তিকে কাজে লাগান

৪. ফিনিশিংয়ে দানবিক শক্তি তৈরি করা

শট নেওয়ার সময় হলান্ড প্রচণ্ড শক্তি উৎপন্ন করতে পারেন। এই কারণে তাঁর শটের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

অত্যন্ত উচ্চ গতির শট

দুই পা দিয়েই শক্তিশালী ফিনিশ

দূরপাল্লার শট নেওয়ার সামর্থ্য

ক্রস থেকে প্রথম স্পর্শেই নিখুঁত ফিনিশ

হলান্ডের শট এত দ্রুতগতির হয় যে গোলরক্ষকদের প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় খুবই কম থাকে।

৫. শুন্যে ভেসে থাকা অবস্থায় অতিমানবিক শারীরিক সক্ষমতা

উচ্চতা, শক্তি এবং দুর্দান্ত লাফানোর ক্ষমতার কারণে হলান্ড শুন্যে ভেসে থাকা অবস্থায় অত্যন্ত বিপজ্জনক। ফ্লাইং অবস্থাতেও তিনি নিজের প্রচন্ড শক্তি ও গতিকে কাজে লাগাতে শিখেছেন। মাটিতে পা না থাকলেও তিনি বিশেষভাবে দক্ষ যে বিষয়গুলোতে:

পেনাল্টি বক্সে হেড জিততে

ক্রস ও কর্নার থেকে গোল করতে

আকাশে ডিফেন্ডারদের শক্তির লড়াইয়ে হারাতে

শক্তিশালী হেডে বলকে গোলমুখে পাঠাতে

তাই প্রতিপক্ষ গভীর রক্ষণে খেললেও তিনি সবসময় বড় হুমকি হয়ে থাকেন।

ফ্লাইং অবস্থাতেও তিনি নিজের প্রচন্ড শক্তি ও গতিকে কাজে লাগাতে শিখেছেন

৬. শরীরের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার

হলান্ড কেবল র এনার্জির ওপর নির্ভর করেন না; তিনি নিজের শরীরকে অত্যন্ত কৌশলে ব্যবহার করেন।

তিনি নিয়মিত যে কাজগুলো করে নিজের গায়ের জোরকে কাজে লাগান সেগুলো হলো:

নিজের শরীরকে বল ও ডিফেন্ডারের মাঝখানে রাখেন।

হালকা টাচ ব্যবহার করে বলের দখল ধরে রাখেন।

অফসাইড এড়াতে নিখুঁত সময়ে দৌড় শুরু করেন।

চতুর মুভমেন্টের মাধ্যমে শট নেওয়ার অ্যাঙ্গেল তৈরি করেন।

হলান্ডের অসাধারণ শারীরিক শক্তিকে আরও কার্যকর করে তুলেছে তার ফুটবল বুদ্ধিমত্তা।

বল ছাড়াও তার অ্যাথলেটিক সক্ষমতা তাকে সমান কার্যকর করে তোলে।

৭. ডিফেন্সের পেছনের ফাঁকা জায়গায় পাওয়ারফুল রান

হলান্ডের সবচেয়ে বড় অস্ত্রগুলোর একটি হলো ডিফেন্ডারদের পেছনের ফাঁকা জায়গায় উচ্চ মোমেন্টামে দৌড় দেওয়া। তাঁর এই পাওয়ারফুল রান যে সুবিধাগুলো দেয় তা হলো:

ডিফেন্ডারদের বারবার পেছনে তাকাতে বাধ্য করে।

রক্ষণভাগে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

সতীর্থদের জন্য পাস দেওয়ার নতুন পথ খুলে দেয়।

গোলরক্ষকের সঙ্গে হেড টু হেড সিচুয়েশন

এ কারণেই অনেক দল বিশেষভাবে হলান্ডের এই দৌড় ঠেকানোর জন্য নিজেদের রক্ষণাত্মক কৌশল বদলে ফেলে।

গোল করার পর এমন দুচারজনকে ঘাড়ে নিয়ে সেলিব্রেট করেন হলান্ড

৮. পুরো ম্যাচজুড়ে শক্তি ধরে রাখা

অনেক শক্তিশালী খেলোয়াড় ম্যাচের শেষদিকে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও হলান্ড পুরো ম্যাচেই উচ্চ মাত্রার শক্তির তীব্রতা বজায় রাখতে পারেন।

দ্বিতীয়ার্ধের শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও তিনি বিস্ফোরণধর্মী স্প্রিন্ট দিতে থাকেন, ফলে ক্লান্ত ডিফেন্ডারদের ভুলের সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন।

এই অসাধারণ স্ট্যামিনাই তাকে ম্যাচের শেষ দিকে গুরুত্বপূর্ণ গোল করার জন্য বিখ্যাত করে তুলেছে।

৯. বিশাল দেহগঠন ও এলিট অ্যাথলেটিক দক্ষতার বিরল সমন্বয়

হলান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এই যে, তিনি এমন সব গুণ একসঙ্গে ধারণ করেন, যা খুব কম খেলোয়াড়ের মধ্যেই দেখা যায়।

তাঁর রয়েছে—

একজন ক্লাসিক টার্গেট স্ট্রাইকারের উচ্চতা

একজন উইঙ্গারের স্প্রিন্টিং গতি

একজন শক্তিশালী সেন্টার-ফরোয়ার্ডের শারীরিক ক্ষমতা

অনেক ছোট গড়নের খেলোয়াড়ের মতো কুইক অ্যাক্সেলারেশন

অসাধারণ ভারসাম্য ও সমন্বয় ক্ষমতা।

এমন ভয়ংকরভাবে চেজ করেন তিনি সবাইকে

এই বিরল সমন্বয় তাঁর সঙ্গে পেরে ওঠাকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। প্রতিপক্ষ শুধু হলান্ডের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বা শুধু শক্তি দিয়ে তাকে থামাতে পারে না, কারণ তিনি দুই দিকেই সমানভাবে দুর্দান্ত। আর্লিং হলান্ডের সাফল্য কেবল প্রাকৃতিক অ্যাথলেটিক দক্ষতার ফল নয়। তাঁর অসাধারণ গতি, বিস্ফোরক অ্যাক্সেলারেশন, অপরিসীম শারীরিক শক্তি, শক্তিশালী ফিনিশিং, বুদ্ধিদীপ্ত মুভমেন্ট এবং নিরলস পরিশ্রম এই সব মিলিয়ে তিনি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে পরিপূর্ণ স্ট্রাইকারদের একজন। তিনি মাঠে নামলে ডিফেন্ডারদের এমন একজন খেলোয়াড়কে সামলাতে হয়, যিনি তাঁদের চেয়ে দ্রুত দৌড়াতে পারেন, শক্তির লড়াইয়ে হারাতে পারেন, শুন্যে ভেসে পরাস্ত করতে পারেন এবং সুযোগ পেলেই নির্মম দক্ষতায় গোল করতে পারেন। যখন এই অসাধারণ শারীরিক গুণাবলি বুদ্ধিদীপ্ত পজিশনিং ও নিখুঁত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন তার ফলাফলকে বলা হয় আর্লিং হলান্ড।

সূত্র: ইনসাইড ফিফা, জার্নাল অব স্ট্রেংথ অ্যান্ড কন্ডিশনিং রিসার্চ

ছবি: ইন্সটাগ্রাম