কথাটি খুব করে মনে পড়ছে। এ দেশের প্রখ্যাতজনেরা একটা কথা বলে আসছিলেন যে জ্ঞানের বাজারদর খুবই কমে গেছে। শিক্ষাব্যবস্থাটা এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেছে, যেখানে জ্ঞানচর্চার কোনো অবকাশ নেই। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী দুজনেই সহজ পথ বের করছেন, যেখানে শুধু সার্টিফিকেট আর নম্বর তোলাটাই গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কথাগুলো নানাভাবে যাঁরা বলেছিলেন, তাঁর মধ্যে অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। আবুল কাসেম ফজলুল হক এ বিষয়ে দীর্ঘ দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন এবং একই কথা বারবার বলেছেন। এমনকি নিজের সন্তান যখন নিহত হন, তখন তিনি কোনো বিচার প্রত্যাশা করেননি। তিনি বলেছেন, ‘শুভবুদ্ধির উদয় হোক’। এই শুভবুদ্ধির উদয় হতে হলে প্রয়োজন জ্ঞানচর্চার। কিন্তু সমাজে সেই ধরনের জ্ঞানচর্চার আভাস দেখা যাচ্ছে না। বরং উল্টোটাই হয়েছে। দুর্নীতি বেড়েছে, দুষ্কৃতকারীরা বেপরোয়া হয়ে গেছে। খুন, রাহাজানি ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে মানবিকতা ও সহনশীলতা কমে গিয়ে প্রতিশোধস্পৃহা মুখ্য হয়ে উঠেছে।
একবার অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আমাদের ‘বিদ্যাসাগর’ নাটক দেখতে এসেছিলেন। নাটক দেখার পর খুবই উত্তেজিত হয়ে তিনি গ্রিনরুমে আসেন এবং বলেন, আরে, এই নাটক তো সব জায়গায় অভিনীত হওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি দৃশ্যের পরে ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু নাটকের আঙ্গিকে এ ধরনের ব্যবস্থার কোনো অবকাশ নেই। তিনি বিষয়টি ভালো করে বোঝেন। নাটকের প্রতি আগে থেকেই তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকাকালীন তিনি নাট্যকার আবদুল্লাহ আল-মামুনকে তাঁর রুমমেট হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। বারবার আবদুল্লাহ আল-মামুন সম্পর্কে আমার কাছ থেকে জানতে চাইতেন। ড. আহমদ শরীফের বাসায় নিয়মিতভাবে স্বদেশচিন্তা সংঘ নামে একটি পাঠচক্র হতো। সেখানে তিনি অংশ নিতেন এবং তাঁর মতামত দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্ত করতেন। নিজে তিনি ‘লোকায়ত’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। এ ছাড়া সার্বক্ষণিকভাবে লেখালেখি এবং বিভিন্ন সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন।
এসব প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে একটি বিষয়ই তাঁর জীবনে মুখ্য ছিল, তা হলো জ্ঞানচর্চা এবং জ্ঞানচর্চায় সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা। কিন্তু একটা সময় দেখতে পেয়েছি, তাঁর অনুসারীদের সংখ্যা না বেড়ে বরং কমে আসছে। এসব ব্যাপারেও তাঁর ব্যাখ্যা ছিল। তিনি ধারণা করতেন, একটা সময়ে এসব আবার বেড়ে যাবে। কারণ সমাজের মধ্যে জ্ঞানের জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হবে। তবে আমরা অনেক কিছু উপলব্ধি করতে পারি না। কিন্তু একটা সময় দেখতে পাই, সমাজে সুপ্ত হয়ে থাকা অনেক বিষয়ই একসময় বিশাল আকারে দেখা দেয়। ষাটের দশকে একটা সময় মনে হয়েছিল যে একনায়ক আইয়ুব খান চিরদিনের জন্য রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকবেন। যেভাবে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর নানা ষড়যন্ত্র ও দমননীতি নিয়ে দেশ শাসন করছে, তাতে আর কোনো মুক্তির আশা নেই। কিন্তু একটা পর্যায়ে দেখা গেল মানুষ যেন একটা সুপ্ত আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা বিস্তার করতে শুরু করেছিল, যার পরিণতিতে প্রথমে গণ-অভ্যুত্থান এবং পরে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে গেল।
আহমদ শরীফের মৃত্যুর পর তাঁর শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় শহীদ মিনারে ব্যাপক জনসমাবেশ হয়েছিল, এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল। এই আপসহীন মানুষটির প্রতি মানুষের যে এত আগ্রহ ও শ্রদ্ধা ছিল, তা আগে বোঝা যায়নি। শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুর সংবাদেও একটা বিশাল জনগোষ্ঠী থমকে গিয়েছিল শোক ও বেদনায়। অর্থাৎ এ দেশের মানুষের প্রকাশভঙ্গির মধ্যেই একটা নির্লিপ্ততা আছে। জীবদ্দশায় এসব মানুষের প্রতি নির্লিপ্ততার সংস্কৃতি চেপে বসল। এদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে কোনো আলাপ-আলোচনা সাধারণত হয় না। গ্যালিলিওর জীবদ্দশায় একই ধরনের সমস্যা হয়েছিল। বিজ্ঞানের চর্চা তখন সমাজে তেমন একটা শুরু হয়নি; যতটা সরব ছিল ধর্মচর্চা। তাই একপর্যায়ে গ্যালিলিওকে আপস করতে হয়েছিল। কিন্তু সত্যের প্রদীপ নেভেনি, ধিকিধিকি জ্বলতে জ্বলতে তা একসময় বিশাল আলোয় পরিণত হয়। সূর্য পৃথিবীটাকে পরিভ্রমণ করে—এই তত্ত্ব সত্য বলে বিবেচিত হতো। আজকের দিনে অবশ্য এত দীর্ঘ সময় লাগে না। প্রযুক্তির কল্যাণে দ্রুতই সত্যটি প্রমাণিত হয়।
আবুল কাসেম ফজলুল হক কখনোই খুব সোচ্চার ও উচ্চকণ্ঠের মানুষ ছিলেন না। তাঁর মতো অনেক নিভৃতচারী মানুষ আমাদের সমাজে এখনো আছে। তাঁর মতোই জ্ঞানমনস্ক মানুষ আমাদের সমাজে আছেন, যাঁরা নানা কারণেই কোণঠাসা হয়ে আছেন। কারণ, সমাজে জ্ঞানচর্চার এবং বিজ্ঞান বিরোধিতার বিপরীতে বিপুলসংখ্যক মানুষ একত্র হয়ে আছে এবং তাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এদের কাজ শুধু জ্ঞানচর্চাকে ব্যাহত করা নয়, চিন্তার ক্ষেত্রে একটি বিভ্রম তৈরি করা। এই বিভ্রান্তকারীরা মিথ্যাকে এমনভাবে সমাজে উপস্থিত করে যে সরলপ্রাণ মানুষ তা-ই বিশ্বাস করতে থাকে। সমাজে হুজুগ ও গুজব সৃষ্টি করতে তারা অত্যন্ত দক্ষ। মানুষ সত্যের বদলে গুজবকে সত্য মনে করে। এসবকে প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজন ছিল জ্ঞানের চর্চা এবং সত্যের অনুসন্ধান করার প্রবণতা বিস্তৃত করা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এ দুটোর কোনোটাকেই উৎসাহিত করেনি। যত দিন পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় সঠিক জ্ঞানচর্চা অনুসরণ করা হয়েছে, তত দিন পর্যন্ত সত্যিকার মানুষ তৈরির ব্যবস্থা চালু ছিল। এর মধ্য দিয়েও যে জ্ঞানপিপাসু মানুষের জন্ম হয়নি, তা-ও ঠিক নয়। কিন্তু জোয়ার বলে একটি কথা আছে। জোয়ার বা স্রোতে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ সত্যকে বলার চেষ্টা করেছে।
এখানে রাজনীতি একটা বড় বিষয়। যারা রাষ্ট্র শাসন করবে, তারাও একপেশে একটা চর্চার মধ্য দিয়ে বড় হয়। কোনো বিরুদ্ধ আলোচনাকে সহনশীলতা দিয়ে গ্রহণ করার মতো কোনো চর্চা তাদের মধ্যে নেই। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা বিশ্বে এই প্রবণতা রয়েছে। তাই প্রতিশোধস্পৃহা একটা মুখ্য প্রবণতা হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। আর তার সঙ্গে আছে ভয়ের সংস্কৃতি। ভয়টা এমন নয় যে সত্য উচ্চারণে তার প্রতিপক্ষ তার মতোই কিছু শব্দ উচ্চারণ করবে, কিন্তু দেখা যায় সত্য উচ্চারণে মৃত্যুর আশঙ্কা আছে। তাই তাকে গুটিয়েই যেতে হয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জ্ঞানের চর্চাকে উৎসাহিত করা হয় না। যেসব রাজনৈতিক দল যেসব ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদান করে, তারা আবার জনবিচ্ছিন্ন স্থানিক বিবেচনাকে চিন্তার মধ্যে না এনে আশ্রয় নেয় দেশি-বিদেশি বই-পুস্তকে। ফলে জনবিচ্ছিন্নতায় এই সব কর্মীরা নিঃসঙ্গ হতে থাকে।
জ্ঞানচর্চার একটা নির্মোহ দিকও আছে, যে নির্মোহ জ্ঞানকে নিরপেক্ষ করে একপেশে তাত্ত্বিকতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সাময়িকী, বই-পুস্তক এবং ইন্টারনেটলব্ধ জ্ঞানের অনেক অত্যাচার আমাদের সামনে রয়েছে। এসব ছাড়াও রয়েছে অনেক অভিজ্ঞ মানুষের সার্বক্ষণিক বয়ান। এসবকে উপেক্ষা করে ফেসবুক-ইউটিউব ক্রমাগতভাবে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়াচ্ছে। এসব তথ্য থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার জন্য প্রয়োজন জ্ঞানচর্চা ও যাচাই করার ক্ষমতা। প্রকৃত জ্ঞানীর সংখ্যা হয়তো আমরা বলতে পারব না, কারণ যাঁরা সুপ্ত রয়েছেন, তাঁদের আমরা চিনি না, জানি না। এই জানার আগ্রহটাও আমাদের বাড়াতে হবে। এই কথাটি জাতীয় পর্যায়ে বিপক্ষ জ্ঞানীর সংখ্যা কমে আসছে। আবার অকারণে কাউকে একটা বিশেষভাবে চিহ্নিত করার প্রবণতাও আছে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রয়োজনে বুদ্ধিজীবীদের বিভক্ত করে ফেলেছে। এই বিভক্তি দেশের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। দেশের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে থাকে প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া শিক্ষকেরা নানাভাবে নানা দলে বিভক্ত। যাঁরা ব্যতিক্রম, তাঁরা কোণঠাসা। এই কোণঠাসাদের সংখ্যা বাড়ানো দরকার, যাঁরা সত্যকে প্রচার করবেন।







