স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘নিউটনের আপেল যেমন গাছ থেকে পড়ে, তেমনি গণ-অভ্যুত্থান কোনো নিয়ন্ত্রণের আড়ালে পড়ে যায়নি। এটিকে পাকতে হয়েছে। এটি ৩৬ দিনের আন্দোলনের ফসল নয়; ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল হিসেবে এই আন্দোলন অর্জিত হয়েছে। কেউ যদি মনে করেন মাত্র ৩৬ দিনের আন্দোলনের মধ্যে ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের কিছুই নেই, তাহলে সেটি রাজনৈতিক অপরিপক্বতা।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আজ শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ছাত্র বন্ধুদের নেতৃত্বকে আমরা অস্বীকার করি না। যারা সম্মুখসারিতে যুদ্ধ করেছেন, রক্ত দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন—কৃতিত্ব তাদের আছে। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনও ছিল।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অর্জন বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘আমরা চাই শহীদদের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হোক। সেই বাস্তবায়নের প্রতিযোগিতা হোক। আমাদের পরিকল্পনা, কর্মসূচি, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার আছে। আমরা সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।’
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংবিধানে এমন সংশোধনী আনা হবে, যার মধ্য দিয়ে শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা যায়। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ যতবারই হোক, মোট ১০ বছরের বেশি দেওয়া হবে না। সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন। একই সঙ্গে আপার হাউস ও লোয়ার হাউসের মধ্যে ভারসাম্য এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় চেক অ্যান্ড ব্যালান্স নিশ্চিত করার বিধান আনা হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যদি শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন না করি, তাহলে বাংলাদেশে আমাদের রাজনীতি করার অধিকার থাকবে না। ২০২৪ আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। এই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে।’
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শেখ হাসিনা ভারতে বসে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, গণতন্ত্র ও এ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য যে বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন, সেটি আমাদের অভিযোগ। এই দায় ভারত এড়াতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা রাজনৈতিকভাবে দাফন হয়েছে। দিল্লিতে বসে যদি শেখ হাসিনা রাজনৈতিক তৎপরতা চালান, তাহলে সেটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে।’
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, আমরাও চাই। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। তবে বাংলাদেশের স্বার্থকে সমুন্নত রেখে এবং পারস্পরিক মর্যাদা ও সম্মানের ভিত্তিতেই সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা ও তার কুশীলবদের বিচার চলমান। কিছু বিচার শেষ হয়েছে, আরও অনেক বিচার চলছে। কিন্তু শেখ হাসিনার কোনো অনুশোচনা নেই। তিনি বাংলাদেশের মানুষের সামনে দুঃখ প্রকাশ করেননি। বরং গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানকে জঙ্গিবাদী তৎপরতা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের আহ্বায়ক ও ইউট্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, প্রোভিসি অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ও ইকরামুল হক সাজিদের পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা দেওয়া হয়। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা ও শহীদদের স্মরণে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।








