জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রামাণ্যচিত্রের অসংগতি নিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদের উপস্থিতিতেই রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। আজ বুধবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভায় এমনটা ঘটে। যার কারণে বেশ কিছুক্ষণ অনুষ্ঠান বন্ধ ছিল।
প্রামাণ্যচিত্রের অসংগতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই প্রামাণ্যচিত্রে অনেক ভুল রয়েছে। আবু সাঈদ এই বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি, তাঁর ছবি না থাকলে এটা কোনো প্রামাণ্যচিত্র হলো না। সেখানে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার ছবিও নাই।
আজ দুপুর ১২টার পরে আলোচনা সভায় সূচনা বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম। সচিবের বক্তব্যের পরে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নির্মিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে সাড়ে পাঁচ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়।
প্রামাণ্যচিত্রটি শুরু হয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথমদিকের স্লোগান ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’ দিয়ে। যেখানে আন্দোলনের বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয়। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে আন্দোলন জোরদার হওয়ার ঘটনা দেখানো হয়। ভিডিওচিত্রে জুলাইয়ের আন্দোলনের শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ মীর মুগ্ধ, শহীদ ওয়াসিমসহ অন্যদের ভিডিওচিত্র দেখানো হয়।
নারী শিক্ষার্থী ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, আন্দোলন দমাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হামলার ঘটনা বর্ণনা করা হয়। আন্দোলন দমাতে ইন্টারনেট বন্ধ নিয়ে জুনাইদ আহমেদ পলকের বক্তব্য। গণ-অভ্যুত্থানের সমর্থনে প্রবাসীদের কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়।
প্রামাণ্যচিত্রের একপর্যায়ে বলা হয়, প্রায় একই সময়ে বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভিডিও বার্তায় নেতা-কর্মী ও দেশবাসীর প্রতি ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়ানো ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানান। এরপর প্রামাণ্যচিত্রে তারেক রহমানের আরেকটি বক্তব্য দেওয়া হয়, সেখানে তিনি বলেন—নির্দেশনা একটাই, দাবি একটাই, দফা এক, দাবি এক, খুনি হাসিনার পদত্যাগ। এরপর ৪ আগস্ট ও ৫ আগস্টের ঘটনা বর্ণনা করা হয়। একপর্যায়ে ডাকসুর নির্বাচনের ছাত্রদল প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলামের ‘প্লিজ, কেউ কাউকে ছেড়ে যায়েন না’ বক্তব্যটি ব্যবহার করা হয়। এরপর ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার ঘটনা, ছাত্র-জনতার বিজয় উল্লাস এবং সবশেষে ঢাকার রাস্তায় জুলাইয়ের স্মরণে আঁকা গ্রাফিতির চিত্র দেখানো হয়।
প্রামাণ্যচিত্রটি শেষ হলেই অনুষ্ঠানস্থলে প্রতিবাদ জানাতে দেখা যায় আগত জুলাই যোদ্ধাদের। শুরুতে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, যুগ্ম সদস্যসচিব মাহিন সরকারকেও প্রতিবাদ জানাতে দেখা যায়। এ সময় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একাধিক ব্যক্তি তাঁদের বসার অনুরোধ করেন। সঞ্চালককে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা শান্ত থাকবেন, আপনাদের সবাইকে শান্ত থাকার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।’ পরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনসহ অন্যদেরও দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে দেখা যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে মাইক নেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি বলেন, ‘আপনারা যা বলবেন, আমরা তা মনোযোগ দিয়ে শুনব। কিন্তু অনুষ্ঠানের শৃঙ্খলার স্বার্থে...।’ এ সময় মাইক নেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তিনি প্রতিবাদকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা নিজেদের জাহির করার জন্য আসছেন, প্রামাণ্যচিত্র দেখানোর জন্য আসছেন, কি করছেন আপনারা? শহীদদের জন্য আপনারা কি করেছেন? আপনারা শহীদ পরিবারের জন্য কি করেছেন? কিছুই করেন নাই আপনারা।’ তখন অনুষ্ঠানস্থলে উত্তেজনা কমার পরিবর্তে আরও বাড়ে। এ সময় তাঁকে থামান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী।
এ সময় মঞ্চের নিচে ছাত্রদল ও এনসিপির নেতা-কর্মীদের বাগ্বিতণ্ডা করতে দেখা যায়। জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য শিশির মনিরকে দুই পক্ষকে থামানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। এ সময় পাল্টাপাল্টি স্লোগান দিতেও দেখা যায়।
পরে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘আপনাদের মধ্য থেকে যাঁরা বক্তব্য দিতে চান, দয়া করে এখানে এসে কথা বলুন। আপনারা শান্ত শিষ্টভাবে বসুন। ইশরাক বসো।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে মাইকে কথা বলতে ডাকেন। এ সময় পুলিশের আইজিপি আলী হোসেন ফকিরকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘স্যার এইগুলোরে কি বাইরে নিয়ে যাব।’ জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘না।’ এরপর আরও কিছুক্ষণ আইজিপিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। পরে তিনি সরে যান।
পরে সঞ্চালক প্রতিবাদকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা সবাই শান্ত হয়ে বসুন, ধৈর্য ধরুন, আপনাদের সবার কথা শোনা হবে। অতিথিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, আপনারা সবাই সহযোগিতা করুন।’ পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খানকে আখতার হোসেনকে মঞ্চে নিয়ে আসার অনুরোধ করেন।
মঞ্চে উঠে আখতার হোসেন বলেন, ‘প্রামাণ্যচিত্রে যে অসংগতিগুলো আছে, এটি যে একপেশেভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, ইতিহাসের যে অংশগুলো মিসিং আছে, সেগুলো নিয়ে আমরা কথা বলব। বিশেষ করে ৩ আগস্ট একদফার যে ঘটনা প্রামাণ্যচিত্রে প্রদর্শিত হয় নাই, সে সমস্ত বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলব। কিন্তু তার আগে আপনাদের কাছে করজোড়ে অনুরোধ করব, আপনারা সুন্দরভাবে বসে পড়বেন, তারপরে আমরা বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলব।’ এ সময় আখতার হোসেনের পাশে জুলাই শহীদ গোলাম নাফিসের বাবা গোলাম রহমানকে দেখা যায়।
পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, ‘প্রামাণ্যচিত্রে যদি কোনো অসংগতি থেকে থাকে, তাহলে সেগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।’ এতে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলে আবারও আলোচনা সভা শুরু হয়। এ সময় বক্তব্য দেন জুলাই শহীদ গোলাম নাফিজের বাবা গোলাম রহমান, জুলাই শহীদ সাজ্জাদ হোসেনের মা শাহীন বেগম, আহত জুলাই যোদ্ধা মোহাম্মদ সুজন, মোহাম্মদ মাহবুব আলম। তাঁদের বক্তব্য শেষ হলে জুলাই শহীদদের পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ ছাড়া আরও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন প্রমুখ।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ভুল তো মানুষ করেই। নিশ্চয়ই ডকুমেন্টারিতে অনেক ভুল রয়েছে। আবু সাঈদ এই বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি, তাঁর ছবি না থাকলে এটা কোনো ডকুমেন্টারি হলো না। সেখানে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার ছবিও নাই। কিছু ভুল হয়েছে এবং এই ভুল মাননীয় মন্ত্রী জোড় হাতে স্বীকার করে বারংবার ক্ষমা চেয়েছেন। এরপর তো শান্ত হওয়া উচিত। জাতীয় অনুষ্ঠানে এটাকে পুষে রেখে সংসদের মতো ওয়াকআউট করা বাঞ্ছনীয় নয়।’
বিশৃঙ্খলা নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আজ এই অনুষ্ঠানটি একটি জাতীয় অনুষ্ঠান। কিন্তু এখানে যে দৃশ্য দেখলাম, সেটি দেখে অত্যন্ত দুঃখিত, লজ্জিত এবং ব্যথিত হয়েছি। সকালে জাতীয় ঐক্য সহজেই প্রতিভাত হয়েছিল। কিন্তু বিকেলের এই অনুষ্ঠানে যা দেখলাম, তা একেবারেই অনভিপ্রেত। এখানে বিদেশিরা বসা ছিলেন, আমি মনে মনে চিন্তা করছিলাম যে, ইংরেজিতেই ভাষণ দেব, বিদেশিরা দেখুক ১৬ বছর আমরা কীভাবে কাটিয়েছি। জাতীয় অনুষ্ঠানে এই ধরনের বিশৃঙ্খলা মোটেই কাম্য ছিল না। বিদেশিদের সামনে যে নাস্তানাবুদ হলাম, এটি আমাকে খুবই ব্যথিত করেছে।’
নেতা ও অনুসারীদের আচরণের সমালোচনা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি লক্ষ্য করেছি মাননীয় সংসদ সদস্য আখতার হোসেন তাঁর অনুসারীদের প্রশমিত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে নেতাকে তো সহজে অনুসারীরা মানে না। প্রতি মুহূর্তেই তাঁরা যে নেতার চেয়ে বড়, এটা প্রমাণের জন্য মুখিয়ে থাকে। সেই কারণেই এই ধরনের একটা অনুষ্ঠানের এই পরিণতি হলো। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কেউ ভুয়া ভুয়া বলে চিৎকার করে, এগুলো কি মানায়? কবে আমরা শিখব?’
আখতার হোসেন বলেন, ‘আন্দোলন যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে, এই কথা প্রামাণ্যচিত্রে উল্লেখ করা হয়নি। নয় দফা অনুপস্থিত থেকে গেল। ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে দেওয়া একদফার ঘোষণা বেমালুম ভুলে গেল। এটা আমাদের আহত করে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে যেমন করে দলীয়করণ করা হচ্ছে, ইতিহাসেও তেমন চেষ্টা করা হচ্ছে।’ প্রামাণ্যচিত্রে সচেতনভাবে বিষয়গুলো করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন আখতার হোসেন।
আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, অনুষ্ঠানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহিন সরকার উপস্থিত থাকলেও তাঁকে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এ ধরনের ধস্তাধস্তির কারণে তিনি হল থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু এখানে নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে সরকার দলীয় নেতা-কর্মীরা এনসিপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা করেছে। তাদের অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দিয়েছে। পরে তিনি অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের হয়ে যান। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা এনসিপির নেতা-কর্মীরাও চলে যান।








