জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনকে গ্রেফতার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। সেই সঙ্গে তাকে হেফাজতে নিয়ে ২ দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুজন সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

এদিকে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার আসামি মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনের পেছনে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশ্রয় ছিল বলে দাবি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান তিনি।

জুলাই হত্যা মামলায় মোজাফফরকে বৃহস্পতিবার হাজির করতে ২১ জুলাই আদেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। সে মোতাবেক সকাল ৯টা ২০ মিনিট তাকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় রাখা হয়। ট্রাইব্যুনাল-২-এর ‘মিস কেস ১/২৬’ মামলায় মোজাফফর হোসেনকে আনা হয়। মামলাটি করেন চিফ প্রসিকিউটর। মামলার অপর আসামি ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ-সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। এদিন ট্রাইব্যুনালের কাছে মোজাফফর হোসেনকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো এবং ২ দিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর।

ট্রাইব্যুনাল আদেশে বলেন, আগের আদেশের ভিত্তিতে আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাকে ২ কর্মদিবসে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হলো। মোজাফফর হোসেনকে সেনা হেফাজতে রাখার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে ৪৫ বছর ধরে পলাতক মোজাফফর হোসেনকে ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর পরদিন তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর মোজাফফরের বয়স এখন ৭৭ বছর।

এদিকে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের অন্যতম এ খুনির বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রথমত মোজাফফর হোসেন দীর্ঘ বছর পলাতক ছিলেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সত্ত্বেও তিনি এক দেশ থেকে আরেক দেশে অবাধে যাতায়াত করেছিলেন। বাংলাদেশেও নির্বিঘ্নে চলাফেরা করেন। এ দেশের টেলিফোনের মাধ্যমে তৎকালীন (আওয়ামী লীগ) সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। থাকতেন অভিজাত এলাকায়। সরকারের প্রশ্রয় বা সংশ্লিষ্টতা না থাকলে এসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক রেখেছেন, তা অনুমান করে নিতে হবে। আমরা মনে করি, তৎকালীন সরকারের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। এর মধ্য দিয়েই মানবতাবিরোধী অপরাধে অংশ নিয়েছেন মোজাফফর। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মতো দুষ্কৃতকারীদের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক ছিল।

আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় সেনা আইনে তার বিচার হবে। এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমাদের তদন্ত চলছে মানবতাবিরোধী অপরাধের। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের কর্মকাণ্ডে তার কী সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, সেটি আমরা দেখব। অর্থাৎ আমাদের বিচারের কার্যক্রম পুরোপুরি আলাদা। তবে তিনি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকবেন। প্রয়োজনমতো সেখান থেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করব। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ট্রাইব্যুনালের প্রচলিত আইনে বিচার চলবে।

এক বছরের মধ্যে জুলাই গণহত্যার সব তদন্ত শেষ হবে : ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সব তদন্ত শেষ করে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জুলাই হত্যার মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যে কোনো মূল্যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। আমরা আশা করছি, এক বছরের মধ্যে জুলাই সম্পর্কিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সব মামলার তদন্ত শেষ করব। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।