জুলাই সনদে থাকা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে নির্বাচিত সরকার ও সংসদের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য শাহদাত হোসাইন সেলিম। তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা, মতামত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। এর বাইরে বাস্তবসম্মত কোনো পথ নেই।

শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘সংস্কার কতদূর? অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ, জুলাই সনদ প্রসঙ্গ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) সভাপতি জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বক্তব্য দেন।

শাহদাত হোসাইন সেলিম বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে ১৬টিতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল। তবে এসব নোট অব ডিসেন্টের সবগুলো বিএনপির দেওয়া নয়।

তিনি বলেন, বিভিন্ন কমিশনের প্রস্তাব এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে বিএনপিকে হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটতে দেওয়া হয়েছে। তবে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে আলোচনা হয়েছে, সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদের অনেক বিষয় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান ও বিদ্যমান আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জন করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন আইনও প্রণয়ন করতে হবে। এসব কাজ শেষ পর্যন্ত জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ও সংসদকেই করতে হবে।

নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে শাহদাত হোসাইন সেলিম বলেন, নারীদের জন্য ৫০টি সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি আরও ৫০টি আসনে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামত ও আলোচনার ভিত্তিতে সংস্কার বাস্তবায়নে একটি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এর বাইরে বাস্তবসম্মত কোনো পথ নেই।

আরও পড়ুন

জুলাই সনদ ইস্যুতে আমরা দুই মেরুতে রয়েছি: ডা. শফিকুর

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে শাহদাত হোসাইন সেলিম বলেন, দীর্ঘদিন নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্যেও বিএনপির নেতাকর্মীরা আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। তাই সংস্কারের বিষয়টি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।

তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সার্বভৌম সংসদই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবগুলোও সেই সংসদের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করতে হবে। জনগণের মতামত ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে হলে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই এগিয়ে নিতে হবে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। অনেক সময় আমাদের ধারণা থাকে, সবকিছু একসঙ্গে হয়ে যাবে। কিন্তু গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও গণতন্ত্র মূলত একটি সামগ্রিক সংস্কৃতি এবং ধারাবাহিক চর্চার বিষয়।

‘গণভোটের রায় অমান্য করলে মানুষ ভোট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে’

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে বিভিন্ন কমিশন গঠন করা হয়েছে, জুলাই সনদ সই হয়েছে এবং এর ভিত্তিতে গণভোটে জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, গণভোটের রায় অস্বীকার করা হলে সেটি জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হবে।

তাজুল ইসলাম বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সব ক্ষমতার উৎস জনগণ। জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশই সংবিধান। ফলে জনগণ রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন চাইলে সেটিকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তিনি সতর্ক করে বলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী কাজ না করলে মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে তাদের ভোটের কোনো মূল্য নেই। এতে মানুষ ভবিষ্যতে ভোটকেন্দ্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।

‘আওয়ামী লীগের পুনর্মিলনের আগে দায় স্বীকার জরুরি’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, আওয়ামী লীগের পুনর্মিলন নিয়ে উদ্বেগের মূল কারণ হচ্ছে দলটির পক্ষ থেকে এখনো যথাযথ দায় স্বীকার দেখা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। যারা দায় অস্বীকার করছে, তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে।’

বিএনপির ৩১ দফার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দলটি তাদের সংস্কার প্রস্তাবের প্রথম দফাই বাস্তবায়ন করছে না। ৩১ দফার প্রথম দফায় সংস্কার কমিশনের কথা ছিল। সেটি অস্বীকার করলে জনগণের কাছে রাজনৈতিক দলটির প্রত্যাশা পূরণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

‘জনপ্রশাসন দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়নি’

জামায়াত নেত্রী সাবিকুন নাহার মুন্নি বলেন, নির্বাচন কমিশনে দলীয় নিয়োগ এবং জনপ্রশাসনে দলীয় প্রভাবের বিষয়গুলো এখন আর গোপন নয়।

তিনি বলেন, জনপ্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গত কয়েক মাসে কী পরিমাণ দলীয়করণ হয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

‘সংস্কার প্রক্রিয়া পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না’

জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর ব্যাপকভাবে সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংস্কার প্রক্রিয়াটি বিজয়ী ও পরাজিত শক্তির বিভাজনে আটকে গেছে।

এসএম/এমআইএইচএস/