মাদক ও অনলাইন জুয়ার প্রতিবাদ করায় হামলার শিকার হয়ে আট দিন ধরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক আরিফুল ইসলাম (৩৫)। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও এখনো তাঁর জ্ঞান ফেরেনি।

আরিফুল ইসলাম লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা গন্ধমরুয়া এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মাদক, জুয়া, বাল্যবিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ নামে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছে। এ আন্দোলনের জেলা পর্যায়ের কমিটিতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ শিক্ষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় আরিফুল ইসলাম নিজ গ্রামের মাদক ও অনলাইন জুয়া বন্ধে স্থানীয়দের সচেতন করছিলেন। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, গন্ধমরুয়া গ্রামের মৃত আনোয়ার হোসেনের ছেলে রহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে হাসান আলী, মেহেদী হাসান, পারভেজ, মমিন মিয়া ও হৃদয় মিয়াসহ কয়েকজন অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত।

মামলার এজাহারে আরও বলা হয়েছে, আরিফুল তাঁদের ডেকে অনলাইন জুয়া থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। অন্যথায় বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হবে বলে সতর্ক করেন। এরপর থেকেই তাঁর ওপর ক্ষোভ তৈরি হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

১ আগস্ট প্রতিদিনের মতো কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছিলেন আরিফুল। এ সময় আগে থেকে ওত পেতে থাকা রহিদুলের নেতৃত্বাধীন একটি দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালায় বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।

হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আরিফুলের মাথায় আঘাত করে তাঁকে গুরুতর আহত করে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসকেরা তাঁকে দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।

রংপুরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে গত আট দিন ধরে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। তবে এখনো তাঁর জ্ঞান ফেরেনি।

গত বৃহস্পতিবার আরিফুলের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।

আরিফুলের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘আট দিন ধরে আইসিইউতে আমার ছেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। অন্যদিকে দুই দিন আগে তাঁর স্ত্রী অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। একদিকে ছেলে, অন্যদিকে ছেলের বউ ও নবজাতক—দুই দিক সামলাতে গিয়ে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি।’

আরিফুলের বাবা আরও বলেন, ‘সমাজকে আলোকিত করতে গিয়ে আজ আমার ছেলে অন্ধকারে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের একাধিক বাসিন্দা বলেন, রহিদুল ও তাঁর সহযোগীরা এলাকায় জুয়ার সঙ্গে জড়িত। তাঁদের জুয়ার কারণে এলাকার অনেক তরুণ সহায়-সম্পদ হারিয়েছেন। কেউ কেউ বাড়ি-গাড়ি বিক্রি করে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন বলেও দাবি করেন তাঁরা।

তাঁদের অভিযোগ, জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে হামলা বা মিথ্যা মামলার ভয় দেখানো হয়। এ কারণে অনেকে মুখ খোলেন না। আরিফুল শুধু জুয়া নয়, সামাজিক অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদেরও ভালো পথে ফেরার আহ্বান জানাতেন। এ কারণে তাঁর ওপর হামলা হয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা।

এ ঘটনায় আরিফুলের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বাদী হয়ে গত ২ আগস্ট রহিদুলকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের বিরুদ্ধে আদিতমারী থানায় মামলা করেন।

মামলার পর আটজন আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে পরিবারকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে প্রধান অভিযুক্ত রহিদুল পলাতক থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব সজীব বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তে করে নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। প্রধান অভিযুক্ত পলাতক থাকায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাঁকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।