জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ও হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি) দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করা হয়েছে। শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, পুষ্পস্তবক অর্পণ, দোয়া, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া আয়োজনের পাশাপাশি শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যের আহ্বান জানানো হয়।
ইবিতে বেলুন উড়িয়ে কর্মসূচির সূচনা
বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে আনন্দের প্রতীক হিসেবে বেলুন উড়িয়ে কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। পরে প্রশাসন ভবনের সামনে থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে টিএসসিসি মিলনায়তনে আলোচনা সভায় মিলিত হয়।
আলোচনা সভায় শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন, জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন এবং শহিদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আব্দুস শহীদ মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক একেএম মতিনুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক এমতাজ হোসেন, ট্রেজারার অধ্যাপক ইদ্রিস আলী এবং রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মনজুরুল হক। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় সভাপতি, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সহস্রাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক একেএম মতিনুর রহমান বলেন, “২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে আমরা যখন আন্দোলন করেছিলাম, তখন আমাদের ভেতরে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। আমাদের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য ছিল না। আমরা যদি এই ঐতিহ্য ও মতপার্থক্য ভুলে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ না হই, তাহলে পিছন থেকে আবার উঁকি দিবে ফ্যাসিস্ট। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে জুলাইয়ে যেভাবে ফ্যাসিস্টকে হটিয়েছি, আবার নতুন করে বাংলাদেশকে ফ্যাসিস্টমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকব।”
তিনি আরো বলেন, “জুলাই আবেগ ছিল কিন্তু পুরোটাই যদি আবেগের বশবর্তী হয়ে আমরা এটিকে সবসময় ধারণ করতে থাকি, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আবার নতুন করে হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। এ দেশ আমাদের। এ দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন, এ দেশটাকে আমরা ভালোবাসি, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হই, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, সমালোচনা থাকবে এবং সেটি আমরা অব্যাহত রাখব।”
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম মাঠে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আবাসিক হলগুলোর অংশগ্রহণে প্রীতি ভলিবল প্রতিযোগিতা এবং নারীদের পিলো পাসিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
হাবিপ্রবিতে দিনব্যাপী কর্মসূচি
দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি) সূর্যোদয়ের সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর সকাল সাড়ে ৯টায় উপাচার্য অধ্যাপক মো. এনামউল্ল্যার নেতৃত্বে জুলাই গণঅভ্যুত্থান র্যালি বের হয়ে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে গিয়ে শেষ হয়।
র্যালি শেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। পরে ডিন কাউন্সিল, হল সুপার কাউন্সিল, বিভিন্ন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সংগঠন, হাবিপ্রবি ছাত্রদল ও হাবিপ্রবি স্কুলসহ বিভিন্ন সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
পরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে উপাচার্যের বাণী পাঠ করা হয়। বাণীতে অধ্যাপক মো. এনামউল্ল্যা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহিদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন। তিনি শহিদ আবু সাঈদ, মোহাম্মদ ওয়াসিম ও মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ আন্দোলনে শহিদ ও আহতদের আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরেন।
জুলাই দিবসে বর্ণাঢ্য আয়োজনে হাবিপ্রবিতে র্যালি
উপাচার্য বলেন, “মৃত্যু অবধারিত জেনেও নিজেদের জীবনবাজি রেখে ফ্যাসিষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যূত্থানে অংশ নিয়ে যারা চিরদিনের জন্য দৃষ্টি হারিয়েছেন, পঙ্গুত্ববরণ করেছেন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন আমি তাদের সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং তাদের আশু রোগমুক্তি ও সুস্থ্যতা কামনা করছি।”
তিনি আরো বলেন, “৩৬ দিনের নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার এই চলমান আন্দোলনে শাসক গোষ্ঠি যে নির্মম বর্বরতা চালিয়েছিল তা মানবতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে শাসক গোষ্ঠি এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে তাদের হত্যাযজ্ঞ থেকে ঘরের শিশুও রক্ষা পায়নি। কিন্তু শত নির্যাতন, নির্মমতা ও নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের পরেও ছাত্র-জনতাকে তাদের ন্যায্য অধিকারের দাবি থেকে এক চুলও সরাতে পারেনি।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বিশ্বব্যাপী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণমানুষের প্রতিবাদের একটি রোল মডেল হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের অবশ্যই ’২৪ জুলাই’ শহিদদের আত্মত্যাগের চেতনা ও মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে গণতন্ত্র ও দেশবিরোধী অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানাবিধ গভীর ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হবে। মনে রাখতে হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।”
হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার এ বিদ্যাপীঠকে আরো সমৃদ্ধ করার আহ্বান জানান উপাচার্য।
দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে টিএসসি প্রাঙ্গণে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন উপাচার্য। বাদ জোহর কেন্দ্রীয় মসজিদে শহিদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে মোমবাতি প্রজ্বালনের মাধ্যমে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে। দিবসটি উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলে আলোকসজ্জা ও শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ নৈশভোজেরও আয়োজন করা হয়।








