ঢাকা: কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন মূলত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ছিল, তখনই ১৬ জুলাই ২০২৪ আরেকটি অধ্যায় খুলে দেয়। রংপুরে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাজধানীর বসুন্ধরা, রামপুরা, বাড্ডা, কুড়িল, ধানমন্ডি, সায়েন্সল্যাব ও উত্তরায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়কে নামেন। আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থী ও সংগঠকদের মূল্যায়নে, সেদিন থেকেই আন্দোলনের গতিপথ বদলাতে শুরু করে।
এর আগে জুলাইয়ের প্রথম দুই সপ্তাহে আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক ক্যাম্পাসগুলো। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তখন মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংহতি জানানো ও ছোট পরিসরের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা বর্ণনা করেন। ১৫ জুলাই ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরতদের ওপর হামলার পর রাতেই বিভিন্ন ব্যাচ গ্রুপ ও মেসেঞ্জারে পরদিন রাজপথে নামার আহ্বান ছড়ায়। রংপুরের সেই মৃত্যুর খবর সেই ক্ষোভকে আরও তীব্র করে বলে আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থীরা দাবি করেন।
ব্র্যাক, নর্থ সাউথ, আইইউবি, এআইইউবি, ইউআইইউ, ড্যাফোডিল, ইউল্যাব, স্ট্যামফোর্ড, ইস্ট ওয়েস্টসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কোনো একক কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অপেক্ষা না করেই ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন বলে জানানো হয়েছে। ফলে আন্দোলন শাহবাগ-কেন্দ্রিক অবস্থান থেকে রাজধানীর উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমে একাধিক ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ে। রামপুরা-বাড্ডা, কুড়িল বিশ্বরোড, ধানমন্ডি-মিরপুর রোড ও উত্তরার মতো করিডোরে একযোগে উপস্থিতির কারণে প্রশাসনকে একাধিক স্থানে সমান্তরালভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয় বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সংগঠক বলেছেন, ১৪ ও ১৫ জুলাই পাবলিক ক্যাম্পাসে হামলার পর আন্দোলন অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছিল; পরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠিত যোগাযোগ বাড়ানো হয় এবং ১৭ জুলাইয়ের পর অংশগ্রহণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তাঁদের ভাষ্য, ১৮ জুলাই উত্তরা থেকে রামপুরা পর্যন্ত হাজারো শিক্ষার্থী রাজপথে নামার পর আন্দোলনের কেন্দ্র রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ছড়িয়ে পড়ে।
কয়েকজন সমন্বয়কারী জানিয়েছেন, দিনের বিক্ষোভের পাশাপাশি রাতে আন্দোলনকারীদের মেস ও বাসায় ‘ব্লক রেইড’-এর মতো অভিযানের অভিযোগ উঠেছিল। তাঁদের দাবি, নজরদারি ও চাপের মধ্যেও অনেক শিক্ষার্থী রাতের আশ্রয় বদল করে পরদিন আবার রাজপথে ফিরেছেন। তাঁদের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খালি হওয়ার পর নেতৃত্ব আরও বিকেন্দ্রীভূত হয় এবং প্রতিটি প্রাইভেট ক্যাম্পাস একেকটি প্রতিরোধকেন্দ্রে পরিণত হয়—যা আন্দোলন টিকিয়ে রাখতে সহায়ক ছিল।
আন্দোলনে যুক্ত অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সঙ্গে সরকারি চাকরির কোটাব্যবস্থার সরাসরি স্বার্থসংশ্লিষ্টতা ছিল না বলে তাঁরা দাবি করেন। কয়েকটি শিক্ষার্থী সংগঠনের নেতৃত্ব বলেছেন, তাঁদের অংশগ্রহণের পেছনে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের হিসাব ছিল না; নাগরিক দায়িত্ববোধ ও সহিংসতার প্রতিবাদই প্রধান কারণ ছিল বলে তাঁদের অবস্থান।
দুই বছর পর সেই অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে মূল্যায়নের আলোচনা উঠেছে। আন্দোলনে যুক্ত কয়েকজন সমন্বয়কারীর দাবি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ ছাড়া আন্দোলন সফল হতো না; কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রতিনিধিত্বের জায়গায় সেই অবদানের প্রতিফলন যথাযথ হয়নি। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, কিছু ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও রাজনীতির মৌলিক সংস্কৃতি খুব একটা বদলায়নি এবং সংস্কারের যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল তার বড় অংশ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকের মতে, জুলাইয়ের অন্যতম অর্জন ছিল পাবলিক-প্রাইভেট বিভাজন ছাপিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি অভিন্ন নাগরিক প্রতিবাদে দাঁড়ানো। সংগঠকদের একাংশের ভাষ্য, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পরই এর মোড় ঘুরে যায়।
প্রতিবেদন: নিউজ অফ বাংলাদেশ। ঘটনাপ্রবাহ জনসমক্ষে প্রকাশিত বিবরণ এবং আন্দোলনসংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে।








