চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইতিহাস বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন শহীদ ফরহাদ হোসেন। চব্বিশের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন তিনি। সেদিন কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে বড় ভাইকে বলেছিলেন, ‘চলেন ভাই, শহীদ হয়ে আসি। এমন সময় জীবনে আর পাওয়া যাবে না।’ মৃত্যুর আগে মায়ের কাছে ফোন ও নিজের মরদেহ পৌঁছে দেওয়ার শেষ অনুরোধ আজও নাড়া দেয় স্বজনদের। তবে, প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল হয়নি বলে জানান ফরহাদের বড় ভাই গোলাম কিবরিয়া।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪ আগস্ট দুপুরে নিজ জেলা মাগুরায় আন্দোলন চলাকালে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ছোড়া গুলিতে মাথায় গুরুতর আঘাত পান ফরহাদ। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শাহাদাত বরণ করেন তিনি।

মৃত্যুর আগে উপস্থিত লোকজনের কাছে তিনি শেষ অনুরোধ করেছিলেন, ‘আমার পকেটে থাকা ফোনটা আর আমার লাশটা আম্মুর কাছে পৌঁছে দেবেন।’ পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই রাতেই গ্রামের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার রায়নগর গ্রামের গোলাম মোস্তফা ও শিরিনা বেগম দম্পতির সন্তান ফরহাদ হোসেন। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবার ছোট।

জুলাই আন্দোলনে শহিদদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে অভ্যুত্থানের পর নির্মাণ করা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হল। সেখানে একটি শোকেসে সংরক্ষণ করা হয়েছে ফরহাদ হোসেনের ব্যবহৃত টি-শার্ট, ডায়েরি, হাতে লেখা নোট এবং গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া মাথায় পরা পতাকা। পাশাপাশি তার বিভিন্ন একাডেমিক নথিও স্থান পেয়েছে এ সংগ্রহশালায়।

শহীদ ফরহাদের বড় ভাই ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী গোলাম কিবরিয়া জানান, মৃত্যুর আগে মায়ের কাছে ফোন ও নিজের মরদেহ পৌঁছে দেওয়ার শেষ অনুরোধ আজও নাড়া দেয় স্বজনদের। তবে, প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তার হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল হয়নি।

গোলাম কিবরিয়া বলেন, “এ খবর শুনে মা ভেঙে পড়েন। তিনি এমনিতেই কার্ডিয়াকের রোগী। কান্না করতে করতে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। জ্ঞান ফিরলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে আবার কান্নায় ভেঙে পড়তেন। টানা দুই দিন তার এমন অবস্থা ছিল।”

এদিকে, প্রায় দুই বছর হতে চললেও ফরহাদ হত্যা মামলার চার্জশিট এখনো দাখিল হয়নি। প্রথমে মামলাটির তদন্ত করে মাগুরা সদর থানা পুলিশ। পরে সেটি জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের বিশেষ শাখায় (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) হস্তান্তর করা হয়।

মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ বিভাগ) খায়রুল হাসান বলেন, “মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। প্রকৃত আসামিদের শনাক্ত করা এবং কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন—সেটি নিশ্চিত করেই তদন্ত করা হচ্ছে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, “জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একমাত্র ক্যাম্পাস, যেখানে দুইজন শিক্ষার্থীকে আমরা হারিয়েছি। তাদের অপরিসীম আত্মত্যাগের প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি এবং আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।”

তিনি বলেন, “দুই শহিদের স্মৃতি ও জুলাইকে স্মরণীয় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি তা দ্রুত বাস্তবায়ন হবে। এছাড়া, শহিদদের পরিবারকে মূল্যায়ন করার ব্যাপারে সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত হয়েছে।”