বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় সিএপিএন১০ জিনের একটি নির্দিষ্ট পরিবর্তনের সঙ্গে টাইপ-টু ডায়াবেটিসের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) গবেষকদের এ গবেষণা ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা পরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

বাংলাদেশে দ্রুত বাড়ছে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও স্থূলতার পাশাপাশি এ রোগের পেছনে জিনগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) একদল গবেষকের গবেষণায় সিএপিএন১০ জিনের একটি নির্দিষ্ট পরিবর্তনের সঙ্গে নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষের টাইপ-২ ডায়াবেটিসের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

গবেষণাটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী জেনোমিকস অ্যান্ড ইনফরমেটিকক্স (ডিওআই: ১০.৫৮০৮/জিআই.২৩০২৩) এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন নোবিপ্রবির বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষকেরা। এর তত্ত্বাবধান করেন বিভাগের শিক্ষক ড. শিপন দাস গুপ্ত। সহ-গবেষক হিসেবে ছিলেন মুনিয়া সুলতানা, মো. মফিজুল ইসলাম, মো. মুরাদ হোসেন, মো. আনিসুর রহমান, শুভ চন্দ্র দাস, ধীরেন্দ্র নাথ বর্মণ ও ফারহানা সিদ্দিকী মিতু।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিএপিএন১০ জিনের সঙ্গে টাইপ-টু ডায়াবেটিসের সম্পর্ক নিয়ে একাধিক গবেষণা হলেও বাংলাদেশের মানুষের ওপর এ ধরনের গবেষণা আগে হয়নি। গবেষকেরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সিএপিএন১০ জিনের এসএনপি-১৯ (আরএস৩৮৪২৫৭০) ভ্যারিয়েন্টের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সম্পর্ক অনুসন্ধানের এটিই প্রথম গবেষণা।

গবেষণায় নোয়াখালী অঞ্চলের ২০২ জন টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগী এবং ৭৫ জন সুস্থ ব্যক্তির রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের বয়স, ওজন, উচ্চতা, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইডসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে আধুনিক পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (PCR) প্রযুক্তির মাধ্যমে সিএপিএন১০ জিনের এসএনপি-১৯ ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, টুআর/থ্রিআর নামে পরিচিত একটি জিনগত বিন্যাস টাইপ-টু ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে সুস্থ মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়া গেছে। এ জিনগত বৈশিষ্ট্য বহনকারীদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ২ দশমিক ৫৭ গুণ বেশি। একইসঙ্গে, টুআর অ্যালিলও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

গবেষকেরা আরো দেখেছেন, এ জিনগত পরিবর্তনের সঙ্গে শরীরের ওজনের সূচক (বিএমআই), সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ, মোট কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসূচকেরও সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, এ জিনগত বৈশিষ্ট্য শুধু ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গেই নয়, রোগের বিভিন্ন বিপাকীয় বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশের হৃদরোগ-সংক্রান্ত জটিলতা ছিল। পাশাপাশি উচ্চ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের হারও তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।

গবেষকেরা জানান, টাইপ-টু ডায়াবেটিস একটি বহুমাত্রিক রোগ। জীবনযাপন, পরিবেশ এবং বংশগত বৈশিষ্ট্য—সবকিছু মিলিয়েই এ রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাদের মতে, নির্দিষ্ট জিনগত বৈশিষ্ট্য আগে থেকেই শনাক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরিতে এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ জন্য আরো বৃহৎ পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষকেরা মনে করেন, নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষের ওপর পরিচালিত এ গবেষণার ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও পুরো বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর জন্য একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে জাতীয় পর্যায়ে আরো বড় পরিসরের গবেষণা জরুরি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জিনগত বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করা গেলে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।