গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে এক গ্লাস ঠান্ডা আমের জুস শরীর ও মনে প্রশান্তি আনে। বাজারে এখন হরেক রকমের আম পাওয়া যাচ্ছে। তবে সব আম জুস তৈরির জন্য সমান উপযোগী নয়। ভালো জুস পেতে হলে আমের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন। এর জন্য আম হতে হবে আঁশহীন, মিষ্টি এবং উচ্চ উৎপাদনশীল ঘন পাল্পযুক্ত। বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক জুস ও পাল্প (ম্যাঙ্গো পিউরি) তৈরিতে বেশ কিছু জাতের আম সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। আসুন জেনে নেওয়া যাক আন্তর্জাতিক বাজারে জুস বা ম্যাঙ্গো স্মুদির জন্য কোন জাতের আমগুলো সবচেয়ে সেরা।
জুস শিল্পের পাওয়ারহাউজ তোতাপুরী
আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্যিক জুস কনসেনট্রেট তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় তোতাপুরী আম। এটি বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক জুস ও ফ্রুট ড্রিংকস শিল্পের আসল পাওয়ারহাউজ। এই আমের নিচের অংশটি তোতাপাখির ঠোঁটের মতো বাঁকানো থাকে। এ জন্যই নাম হয়েছে তোতাপুরী। এই আমে টক এবং মিষ্টির এক চমৎকার ভারসাম্য থাকে, যা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সেরা। এর থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ জুসের পাল্প পাওয়া যায় এবং দামেও এটি বেশ সাশ্রয়ী।
আরও পড়ুন
কলা, আপেল নাকি তরমুজ: উৎপাদনে বিশ্বসেরা কোন ফল?

তোতাপুরী আম/ ছবি: পেক্সেলস
প্রিমিয়াম জুসের রাজা আলফোনসো
আপনি যদি আন্তর্জাতিক মানের প্রিমিয়াম জুসের স্বাদ পেতে চান, তবে আলফোনসো আমের জুস ট্রাই করতে পারেন। বিশ্বজুড়ে নামী ব্র্যান্ডের জুস এবং স্মুদি তৈরিতে এই আলফোনসো আম ব্যবহার করা হয়। এর মসৃণ টেক্সচার ও গাঢ় জাফরান রঙ জুসকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তোলে। তীব্র সুগন্ধ ও আঁশহীন গুণের কারণে একে ‘আমের রাজা’ও বলা হয়। এটি ব্লেন্ড করলে খুব মসৃণ জুস বা ম্যাঙ্গো স্মুদি তৈরি হয়।
আমেরিকা ও ইউরোপের ভরসা টমি অ্যাটকিন্স
আমেরিকা এবং ইউরোপের জুস প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো লাতিন আমেরিকা থেকে আমদানি করা টমি অ্যাটকিন্স আম বেশি ব্যবহার করে। ফ্লোরিডার এই জাতটি তার চমৎকার লালচে রঙের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এর শক্ত চামড়া এবং দীর্ঘ স্থায়িত্বের কারণে পরিবহনের সময় সহজে নষ্ট হয় না। বাণিজ্যিক জুস তৈরিতে এই আমের রঙের কারণে জুসের ‘ভিজ্যুয়াল অ্যাপিল’ অনেক বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন
হিমসাগর-ল্যাংড়াকে হটিয়ে ‘সেরা’ আম এখন আম্রপালি
মসৃণ টেক্সচারের জন্য কেন্ট আম
টমি অ্যাটকিন্সের পাশাপাশি জুস তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে কেন্ট আমের চাহিদাও ব্যাপক। কেন্ট আম অত্যন্ত মিষ্টি এবং এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি সম্পূর্ণ আঁশহীন। আঁশমুক্ত হওয়ায় এই আম ব্লেন্ড করলে জুস খুব মসৃণ এবং ঘন হয়। বড় আকারের এই আম থেকে প্রচুর পরিমাণে জুসের পাল্প বা পিউরি পাওয়া যায়, যা বাণিজ্যিক উৎপাদনের খরচ কমায়।
পাকিস্তানের সিন্ধ্রি আম/ ছবি: খালিদ মাহমুদ, উইকিমিডিয়া কমনস
মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে সিন্ধ্রি ও চৌসা
পাকিস্তানের বিখ্যাত জাত সিন্ধ্রি ও চৌনসা মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার বাজারে বাণিজ্যিক জুস ও কনসেনট্রেট তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সিন্ধ্রি আমটি আকারে বড়, ডিম্বাকৃতির এবং অত্যন্ত সুগন্ধযুক্ত হয়। এর জুস চমৎকার হলদে রঙের ও মিষ্টি স্বাদের হয়ে থাকে। অন্যদিকে, চৌসা আমের মিষ্টি স্বাদ এবং অনন্য সুবাস জুসকে এক ভিন্ন মাত্রা দেয়। এই দুটি জাতের আম প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য অত্যন্ত লাভজনক।
বাংলাদেশে কোন আম দিয়ে জুস করবেন?
বাংলাদেশে ফলের জুসের বাজারে আমের জনপ্রিয়তাই সবচেয়ে বেশি। দেশে প্যাকেটজাত জুসের বড় একটি বাজার রয়েছে। তবে ঘরে তৈরি ফ্রেশ জুসের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুষ্টিবিদদের মতে, জুস বানানোর জন্য এমন আম বেছে নেওয়া উচিত যাতে বাড়তি চিনি মেশাতে না হয়। আঁশমুক্ত আম ব্লেন্ড করলে জুস খুব মসৃণ এবং ঘন হয়।
আরও পড়ুন
সাতক্ষীরা / উপকূলে লবণের কাছে হার মানছে আম-কাঁঠাল

আম্রপালি ও হিমসাগর
জুস ও মিল্কশেকের জন্য দেশের ফলপ্রেমীদের প্রথম পছন্দ আম্রপালি। এই আম আকারে মাঝারি হলেও এর ভেতরের শাঁস বা পাল্প বেশ ঘন ও গাঢ় কমলা রঙের হয়। আম্রপালি অত্যন্ত মিষ্টি হওয়ায় জুসে আলাদা করে চিনি দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
স্বাদ ও সুগন্ধের জন্য হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাতি আমের জুড়ি মেলা ভার। এই আমটি পুরোপুরি আঁশহীন এবং এর চমৎকার সুঘ্রাণ জুসের স্বাদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। হিমসাগরের ঘন পাল্প দিয়ে তৈরি জুস বা স্মুদি খেতে দারুণ সুস্বাদু হয়।
বেশি জুস পেতে ল্যাংড়া ও ফজলি
ল্যাংড়া আমের একটি নিজস্ব টক-মিষ্টি স্বাদ এবং তীব্র সুবাস রয়েছে। এই আম দিয়ে জুস বানালে বেশ রিফ্রেশিং একটি স্বাদ পাওয়া যায়। ল্যাংড়া আমের শাঁস নরম হওয়ায় এটি খুব সহজেই ব্লেন্ড হয়ে যায়।
অন্যদিকে, যারা বেশি পরিমাণে জুস তৈরি করতে চান, তাদের জন্য ফজলি আম আদর্শ। ফজলি আম আকারে অনেক বড় হয় এবং এতে প্রচুর পরিমাণে শাঁস থাকে। ফলে অল্প আম দিয়েই অনেক বেশি পরিমাণে ঘন জুস প্রস্তুত করা সম্ভব।
সূত্র: ওয়াসিস মার্কেট, শিমলা হিলস, এমএমএ ফার্মস, ম্যাঙ্গো
কেএএ/








