জুস্ত ফঁতেন প্রয়াত হয়েছেন তিন বছর আগে। ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ৮৯ বছর বয়সে মর্ত্যলোক ত্যাগ করেছেন ফরাসি কিংবদন্তি। জীবদ্দশায় তিনি খুব ভালোভাবেই দেখে গেছেন এ গ্রহের লিওনেল মেসি নামের এক ফুটবল জাদুকরকে। দেখে গেছেন, তাঁর দেশের ‘গোল মেশিন’ কিলিয়ান এমবাপ্পেকে। এই মেসি-এমবাপ্পে যে তাঁর ৬৮ বছরের পুরোনো রেকর্ড নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলবেন, তা আর দেখা হয়নি ফঁতেনের।

কে জানে, স্বর্গ থেকে দেখতেও পারেন; দুই গোল মেশিনের পাল্লা দেখে মুচকি হাসতেও পারেন। ফঁতেন—নামটা শুনলে সবার আগে চোখে ভাসবে তাঁর সেই অমর রেকর্ড। পেলে যে বিশ্বকাপে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন, সেই ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফঁতেনের গড়া ১৩ গোলের রেকর্ড এখনো অক্ষত।

৬৮ বছরে রেকর্ডটি কেউ ভাঙতে পারেনি, কখনো ভাঙবে কি না, তা নিয়েও এত দিন যে ঘোর সংশয় ছিল, সেটি প্রায় দূর করে ফেলার দিকে দুরন্ত গতিতে ছুটছেন ফঁতেনেরই স্বদেশি এমবাপ্পে। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের আগেই ৮ গোল হয়ে গেছে এমবাপ্পের। হাতে আছে আরও অন্তত ২ ম্যাচ। যদি ফাইনালে নাও ওঠা হয়, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ তো মিলবেই। ২ ম্যাচে ৫ গোল করলেই ধরে ফেলা যাবে ফঁতেনকে। অনেক কঠিন কাজ, কিন্তু অসম্ভব তো নয়। মেসিই যেমন এই বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ২ ম্যাচে ৫ গোল করেছেন।

অবশ্য মেসির সামনে এ সুযোগটা আরও বেশি। কোয়ার্টার ফাইনাল পেরিয়ে সেমিফাইনালে উঠতে পারলে তিনি পাবেন ৩ ম্যাচ। মেসি জাদু আরও বেশি দেখা গেলে ৩ ম্যাচে ৫ কেন, মেসি ‘৬’ গোলও দিতে পারেন। আর ৬ গোল দিতে পারলেই ফঁতেনের বিরল রেকর্ডটা নিজের করে নিতে পারবেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। দুই তারকা ফঁতেনের অমরত্ব পাওয়ার রেকর্ড নিজেদের করে নেওয়ার হুমকি দিলেও কাজটা যে কতটা কঠিন, বিশ্বকাপ ইতিহাস দেখলেই বোঝা যাবে।

২০ গোল করে এমবাপ্পে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসির (২১) পেছনে। ২৭ বছর বয়সী এমবাপ্পেকে এই রেকর্ড গড়তে খেলতে হয়েছে তিনটি বিশ্বকাপ, ৩৯ বছর বয়সী মেসির চলছে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। এমনকি তাঁরা যে মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ রেকর্ড কেড়ে নিয়েছেন, সেই জার্মান কিংবদন্তিকেও খেলতে হয়েছে চারটি বিশ্বকাপ। ১৩টির অর্ধেকেরও কম, অর্থাৎ ৫ গোল করেই যেখানে কোনো কোনো বিশ্বকাপে মিলেছে ‘গোল্ডেন বুট’, সেখানে ১৩ গোল করতে কী কঠিন শৃঙ্গ জয় করতে হবে, বুঝতেই পারছেন।

রেকর্ডটা দেখলে শুধু মনে হবে, জুস্ত ফঁতেন কী অসাধ্য কাজটাই না করেছেন ৬৮ বছর আগে। অথচ তাঁর দুর্ভাগ্য, বারবার চোটে পড়ায় জাতীয় দলের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে ২৭ বছরেই! ত্রিশের আগেই অবসর নিতে হয়েছে পেশাদার ফুটবল থেকে। যে বিশ্বকাপে ৬ ম্যাচে ১৩ গোলের অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছিলেন, তাতেও চোটের ভূমিকা ছিল। বিশ্বকাপের ৬ মাস আগে চোটে পড়েছিলেন। চোট কাটিয়ে উঠে বিশ্বকাপের আগে ক্লাব ফুটবলের ব্যস্ততা তাঁর আর ছিল না। বিশ্বকাপ দিয়ে যখন মাঠে ফিরলেন, তখন তিনি অনেক সতেজ আর আত্মপ্রত্যয়ী।

ফঁতেনের সময়ে গোল্ডেন বুটের প্রচলন ছিল না। এটি চালু হয়েছে ১৯৮২ বিশ্বকাপ থেকে। তবে তিনি সেই ১৯৫৮ বিশ্বকাপে যা করে গেছেন, তা অনেক ফরোয়ার্ড বা স্ট্রাইকারদের কাছে এখনো বিরাট এক স্বপ্ন। আধুনিক ফুটবলের শক্তিশালী রক্ষণভাগ, চুলচেরা বিশ্লেষণে তাঁর রেকর্ডটা ভাঙা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করা হচ্ছিল এত দিন। সেই রেকর্ড ভাঙা এবারও সহজ নয়। নকআউটের শেষ ভাগে মেসি কিংবা এমবাপ্পেরা পাবেন তুলনামূলক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। তবে মেসি-এমবাপ্পেরা তো আর দশজনের চেয়ে আলাদা। বড় ম্যাচের মঞ্চে নিজেদের সেরাটা দেখানোটাই তাঁদের কাজ। সামনের ম্যাচগুলোয় সেটা যদি মেসি কিংবা এমবাপ্পে করে দেখাতে পারেন, তাহলে সে রেকর্ড ভেঙে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না!