২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে স্পেনে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম দ্য অবজেকটিভ-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মরক্কো কূটনৈতিক তৎপরতা ও ব্যাপক লবিংয়ের মাধ্যমে ফাইনাল আয়োজনের দৌড়ে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে গেছে। এমনকি স্পেনের ফুটবল অঙ্গনের ভেতরেও ধারণা তৈরি হয়েছে যে, মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ফাইনাল হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় নেই বললেই চলে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো হলেও সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ম্যাচ অর্থাৎ ফাইনাল আয়োজনের জন্য এখন শক্তিশালী প্রার্থী কাসাব্লাঙ্কার হাসান দ্বিতীয় স্টেডিয়াম। এই স্টেডিয়ামকে ঘিরে বিশাল নগর উন্নয়ন প্রকল্পও রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় বড় নির্মাণ ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাইনাল স্পেনে রাখতে এখন সরকারের একমাত্র বিকল্প পরিকল্পনা হলো বার্সেলোনার নতুন ক্যাম্প ন্যুকে সামনে আনা। প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই স্টেডিয়াম টিকিট বিক্রির সম্ভাব্য আয়ে মরক্কোর সঙ্গে ব্যবধান কমাতে পারে বলে মনে করছে মাদ্রিদ।
স্প্যানিশ সরকারের ধারণা, ক্যাম্প ন্যুকে চূড়ান্ত ভেন্যু হিসেবে প্রস্তাব করলে কাসাব্লাঙ্কার তুলনায় আর্থিক ব্যবধান অনেকটাই কমে আসবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেখানে মরক্কো প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ইউরো অতিরিক্ত আয়ের যুক্তি তুলে ধরছে, সেখানে ক্যাম্প ন্যুকে বেছে নিলে সেই ব্যবধান প্রায় ৫০ মিলিয়ন ইউরোতে নেমে আসতে পারে।
প্রতিবেদনটি স্পেনের আগের ফুটবল প্রশাসনেরও কঠোর সমালোচনা করেছে। বিশেষ করে সাবেক সভাপতি লুইস রুবিয়ালেস এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা যৌথ বিডের গুরুত্বপূর্ণ নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি যে ফাইনাল অবশ্যই সান্তিয়াগো বার্নাব্যু বা ক্যাম্প ন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে। স্প্যানিশ ফুটবল মহলের মতে, এই কৌশলগত ভুলের সুযোগই কাজে লাগিয়েছে মরক্কো।
তুলনা টেনে প্রতিবেদনে ২০২৬ বিশ্বকাপের উদাহরণও দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিডে শুরু থেকেই নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামকে একমাত্র ফাইনাল ভেন্যু হিসেবে নির্ধারণ করেছিল। মেক্সিকো সিটির আজটেকা স্টেডিয়াম কিংবা ডালাসের আগ্রহ থাকলেও সেগুলো বিবেচনায় আনা হয়নি এবং বিষয়টি ফিফা কাউন্সিলের ভোট পর্যন্তও গড়ায়নি।
অন্যদিকে ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল ভেন্যু নির্ধারণে ফিফা কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত লাগবে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। আর সেই কারণেই মরক্কো কাউন্সিলের ৩৭ সদস্যের সমর্থন নিশ্চিত করতে ব্যাপক লবিং চালাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরক্কোর কাউন্সিলে প্রতিনিধি থাকলেও স্পেনের নেই; তাদের পক্ষে একজন ইংরেজ ও একজন হাঙ্গেরিয়ান উপদেষ্টা কাজ করছেন।
স্প্যানিশ কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এবং সরকার ফাইনাল স্পেনে রাখার সম্ভাবনা ধরে রাখতে ক্যাম্প ন্যুকে সামনে আনার পরিকল্পনা করছে। তবে স্পেনের ফুটবল প্রশাসনের অনেকেই মনে করেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন এবং ফিফার শীর্ষ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত অনেকটাই আগেই নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে স্পেন সরকারের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। ফুটবল মহলের অভিযোগ, মরক্কোর বিপক্ষে কূটনৈতিক লড়াইয়ে সরকারের সক্রিয় সমর্থন প্রায় অনুপস্থিত ছিল। ফলে পুরো দায়ভার বহন করতে হয়েছে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনকে।
মরক্কোর কৌশলগত তৎপরতার পেছনে দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নামও উল্লেখ করা হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আমরানি এবং মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফৌজি লেকজা। প্রতিবেদনের দাবি, লেকজার সঙ্গে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি ২০২৬ বিশ্বকাপে মরক্কো-ফ্রান্স ম্যাচে ইনফ্যান্তিনোকে লেকজা ও আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি প্যাট্রিস মোৎসেপের সঙ্গে একসঙ্গে খেলা দেখতে দেখা যায়।
দ্য অ্যাথলেটিক আরও দাবি করেছে, আফ্রিকা, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও ওশেনিয়া অঞ্চলের সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন, কাতার এবং সৌদি আরবের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ আমেরিকার কনমেবল অঞ্চলের ভোট বিভক্ত করারও চেষ্টা চলছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এশিয়ার ক্ষেত্রে কাতারের শেখ হামাদ আল থানি এবং সৌদি আরবের ইয়াসের আল মিসেহাল; যারা ফিফা কাউন্সিলের সদস্য—তাদের ভূমিকার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং মরক্কোর রাজা মোহাম্মদ ষষ্ঠের সুসম্পর্কও মরক্কোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সহায়ক হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ফিফা এখনো ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল কোন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। স্পেনের সম্ভাবনা কমে যাওয়া বা মরক্কো এগিয়ে থাকার বিষয়গুলো দ্য অবজেকটিভ-এর নিজস্ব সূত্র ও প্রতিবেদনের দাবি; এগুলো এখনো ফিফার আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়।
আরআর/এমএমআর








