কবিতা আমাকে ‘হেলাল হাফিজ’ বানিয়েছে। একটা পরিচিতি পেয়েছি। কিন্তু আমার সব সময়ই মনে হয়, সে তুলনায় আমি কিছুই দিতে পারিনি। মাত্র দুটি বই। ভাবো একবার। মাঝেমধ্যে মনে হয় আমি অন্যায় করেছি, নিজের সঙ্গে, পাঠকের সঙ্গে। মাথায় কত কিছু আসছে, কিন্তু লিখতে সাহস হয়নি। যদি ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র মতো না হয়? আমাকে যদি গ্রহণ না করে মানুষ? কবিতা দিয়ে সবাই জমায় টাকা, আমি চাই মানুষ জমাতে। এ জমানো মানুষকে হারাতে চাইনি। তবে এখন ভাবি, উচিত ছিল আরও কিছু করার।

আমি একটি ঘটনা তোমাকে বলি। তাহলেই বুঝবে আমি কবিতা লিখে কী পেয়েছি। একবার সিলেটের একটি কবিতার অনুষ্ঠান। তারা কিন্তু মহাপ্রাণ শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না। ভালোবাসা হয়ে যায় বালোবাসা।

যা হোক, অনুষ্ঠানের পরে এক ভদ্রলোক আরেকটি ছেলের হাত ধরে আমার কাছে এলেন। তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। আমার হাতটা ধরে বললেন, ‘ভাই আমি তো জন্মান্ধ, কিন্তু দুটি জিনিস আমি স্পষ্ট দেখতে পাই, আমি যখন আমার অর্ধাঙ্গিনীকে...’।

আমি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আপনি অর্ধাঙ্গিনী বললেন কেন? আপনি স্রষ্টাঙ্গিনী বলতে পারলেন না?’

সঙ্গে সঙ্গে উনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর বললেন, ‘আমি অন্ধ হয়েও আমার সহধর্মিণীর শরীরে আঙুল দিয়ে দেখতে পারি, কোন জায়গাটা অধিকতর ফরসা, কোন জায়গাটা অধিকতর কালো। আরেকটা জিনিস আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। ওই যে আপনি বলেছেন, “পাথরচাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট”—ওই সাদাটাও আমি দেখতে পাই।’

এটা শুনে আমার চোখ দিয়ে পানি চলে এল।

তথ্যসূত্র: রাকিবুজ্জামান লিয়াদ কর্তৃক কবি হেলাল হাফিজের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, ২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর যুগান্তর পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত