আমি জীবন নামের রেলগাড়ির একজন যাত্রী। বহুপথ চলেছি, বহুদূর গিয়েছি, বহুকিছু দেখেছি। জীবনের এই দীর্ঘ যাত্রাপথে মানুষের হাসি দেখেছি, কান্না দেখেছি, স্বপ্ন দেখেছি, আবার সেই স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার নীরব শব্দও শুনেছি।

প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা, মায়া, অভিমান, বিচ্ছেদ, এসবের কিছুটা অভিজ্ঞতাও হয়েছে। ছোটবেলা, কৈশোর এবং বেড়ে ওঠার দিনগুলো যে মহাদেশে কেটেছে, যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে নিজেকে গড়ে তুলেছি, তার সঙ্গে পাশ্চাত্যের জীবনধারার অনেক পার্থক্য রয়েছে।

চিন্তাভাবনা আলাদা, সম্পর্কের প্রকাশ আলাদা, জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় পৃথিবীর সব মানুষ এক। সেটি হলো হৃদয়ের অনুভূতি। মানুষ যখন ভালোবাসে, তখন তার হৃদয়ের ভাষা একই থাকে। আর যখন সেই বিশ্বাসে আঘাত আসে, তখন কষ্টের রংও একই হয়ে যায়। পৃথিবীর কোনো মানচিত্র সেই ব্যথাকে আলাদা করতে পারে না।

সেই উপলব্ধি থেকেই দুটি ভিন্ন মহাদেশের দুটি ভালোবাসার গল্প তুলে ধরছি। একটি গল্পের পটভূমি আবেগঘন এক সমাজ, অন্যটির পটভূমি আধুনিক ইউরোপের স্বাধীন পরিবেশ। কিন্তু দুজন মানুষের জীবনের একটি জায়গায় আশ্চর্য মিল ছিল, তারা দুজনেই ভালোবেসেছিল বিশ্বাস নিয়ে। আর সেই বিশ্বাসেই এসেছিল আঘাত।

কাজ নেই আর আমার ভালোবেসে, আমি তার ছলনায় ভুলবো না। বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন। এমন এক বৃষ্টি, যেখানে শহরের বাইরের সব শব্দ ধীরে ধীরে মুছে যায়, অথচ মানুষের ভেতরের কথাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আরিফ জানালার পাশে বসে ছিল। সামনে এক কাপ চা। চা অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। তবুও সে কাপটি সরিয়ে রাখেনি। কিছু কিছু জিনিস মানুষ ব্যবহার করার জন্য ধরে রাখে না, ধরে রাখে স্মৃতির কারণে।

যেমন সে ধরে রেখেছিল কিছু পুরোনো ছবি, কিছু অসমাপ্ত কথা, কিছু প্রতিশ্রুতি এবং কিছু মুহূর্ত, যেগুলো একটা সময় তার কাছে পুরো পৃথিবীর চেয়েও মূল্যবান ছিল।

নিলার সঙ্গে আরিফের পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর দীর্ঘ কথোপকথন, তারপর এমন এক সম্পর্ক, যার কোনো আনুষ্ঠানিক নাম না থাকলেও দুজনেই জানত, সেটি ভালোবাসা। নিলা বলত, ‌‘একদিন যদি পৃথিবীর সবাই তোমাকে ভুলে যায়, আমি তোমাকে কখনো ভুলব না।’

আরিফ বিশ্বাস করেছিল। কারণ মানুষ যখন সত্যিকারের ভালোবাসে, তখন সে প্রমাণ খোঁজে না। সে বিশ্বাস করে। আর অনেক সময় সেই বিশ্বাসই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।

বছরের পর বছর আরিফ নিজের স্বপ্নের চেয়ে নিলার স্বপ্নকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। নিজের কষ্ট লুকিয়ে তার কষ্টকে নিজের করে নিয়েছে। নিলা যখন ভেঙে পড়েছে, আরিফ তাকে সাহস দিয়েছে। নিলা যখন পথ হারিয়েছে, আরিফ তাকে ফিরে আসার পথ দেখিয়েছে।

কিন্তু একদিন আরিফ বুঝতে পারল, সে যাকে ভালোবাসা ভেবেছিল, নিলা হয়তো সেটাকে একই গভীরতায় অনুভব করেনি। প্রথমে সে বিশ্বাস করতে পারেনি। তারপর ধীরে ধীরে সত্যগুলো সামনে আসতে লাগল।

যে কথাগুলো নিলা শুধু তাকে বলেছে বলে মনে করেছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই অন্য কারও কাছেও বলা হয়েছে। যে প্রতিশ্রুতিগুলো আরিফকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেগুলোর কিছু হয়তো ছিল শুধু সেই মুহূর্তকে সহজ করার উপায়।
সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল বিচ্ছেদ নয়।

সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল, যে মানুষটিকে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে সত্য মানুষ ভেবেছিল, সেই মানুষটিই একদিন তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ালো। এক সন্ধ্যায় নিলা আবার ফিরে এসেছিল। হয়তো কোনো নতুন কষ্টের পর, হয়তো কোনো নতুন একাকীত্বের মুহূর্তে।

সে ধীরে বলেছিল, ‘তুমি কি আমাকে আরেকটা সুযোগ দিতে পারো?’ আরিফ অনেকক্ষণ নীরব ছিল। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলেছিল, ‘একসময় পারতাম। কারণ তখন আমি তোমাকে ভালোবাসতাম। এখন আর পারি না। কারণ এখন আমি তোমাকে চিনেছি।’


নিলা মাথা নিচু করে বসে ছিল। আরিফ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলেছিল, ‘ভালোবাসা হারিয়ে গেলে মানুষ কাঁদে। কিন্তু বিশ্বাস হারিয়ে গেলে মানুষ বদলে যায়। তুমি আমার ভালোবাসা হারাওনি, তুমি আমার বিশ্বাস হারিয়েছো।’

সেদিন নিলার কাছে কোনো উত্তর ছিল না। কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর শব্দে দেওয়া যায় না। অনেক বছর পরে আরিফের জীবনে নতুন মানুষ এসেছে, নতুন সম্পর্ক এসেছে। জীবন আবার নিজের গতিতে চলেছে। কিন্তু কিছু স্মৃতি আছে, যেগুলো আর ব্যথা দেয় না, শুধু মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বাস কত মূল্যবান। আর তখন তার মনে ভেসে ওঠে একটি বাক্য, ‘কাজ নেই আর আমার ভালোবেসে, আমি তার ছলনায় ভুলবো না।’

তুষারের দেশে আরেকটি ভালোবাসার গল্প

পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, সুইডেনের স্টকহোমের উপকণ্ঠে, আরেকটি গল্পের শুরু হয়েছিল। এলিন আর লুকাসের পরিচয় হয়েছিল ষোল বছর বয়সে। প্রথমে একই স্কুল, তারপর একই বন্ধুদের দল, তারপর ধীরে ধীরে একজন আরেকজনের জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিল।

সুইডেনের সমাজে কিশোর কিশোরীদের সম্পর্ক অনেক বেশি স্বাধীন। পরিবার জানে, বন্ধুরা জানে, ভালো লাগা বা ভালোবাসার কথা প্রকাশ করাও সেখানে অস্বাভাবিক নয়। এলিনের পরিবার লুকাসকে পছন্দ করত। লুকাসের পরিবারও এলিনকে আপন করে নিয়েছিল। দুই বছর ধরে তাদের ছোট পৃথিবী ছিল সুন্দর।

স্কুল শেষে একসঙ্গে কফি খাওয়া, গ্রীষ্মের দীর্ঘ সন্ধ্যায় লেকের পাশে বসা, শীতের দিনে তুষারের মধ্যে হাঁটা, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা, সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের নির্মল আনন্দ। তারা ভাবত, এই সম্পর্ক হয়তো অনেক দূর যাবে। কিন্তু জীবন সব সময় মানুষের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না।

আঠারো বছর বয়সের কাছাকাছি এসে এলিনের জীবনে পরিবর্তন আসতে শুরু করল। নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধু, নতুন ভবিষ্যতের চিন্তা তাকে ধীরে ধীরে অন্যদিকে নিয়ে গেলো। লুকাস প্রথমে বিষয়টি বুঝতে পারেনি। সে ভেবেছিল, হয়তো ব্যস্ততা।
হয়তো সাময়িক পরিবর্তন।

কিন্তু একদিন সে জানতে পারলো, এলিন তার অজান্তে অন্য একজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। সম্পর্ক শেষ করার সাহস না পেয়ে সে একই সময়ে দুটি বাস্তবতার মধ্যে বেঁচে ছিল। লুকাসের কষ্ট ছিল শুধু এলিনকে হারানো নয়। কষ্ট ছিল সেই কথাগুলো মনে পড়া, ‘আমি ব্যস্ত’। ‘আজ পড়াশোনা আছে।’ ‘আজ বন্ধুদের সঙ্গে আছি।’ কিন্তু সত্য ছিল অন্য কোথাও। যেদিন সম্পর্ক শেষ হলো, সেদিন কোনো বড় ঝগড়া হয়নি।

একটি ছোট ক্যাফের কোণে বসে এলিন শুধু বলেছিল, ‘আমার মনে হয়, আমি আর আগের মতো অনুভব করি না।’ লুকাস কিছুক্ষণ চুপ ছিল। তারপর বলেছিল, ‘অনুভূতি বদলাতে পারে। সেটা আমি বুঝি। কিন্তু সত্যিটা বলতে এত দেরি করলে কেন?’

এলিন কোনো উত্তর দিতে পারেনি। সেদিন লুকাস বুঝেছিল, বিচ্ছেদের কষ্টের চেয়েও গভীর হলো সেই মুহূর্ত, যখন মানুষ জানতে পারে তার বিশ্বাসের জায়গাটিই আর আগের মতো নেই। কয়েক মাস পরে নিজের ডায়েরিতে সে লিখেছিল, ‘আমি তাকে হারানোর জন্য কাঁদছি না। আমি কাঁদছি সেই মানুষটাকে হারানোর জন্য, যাকে আমি সত্যি বলে বিশ্বাস করেছিলাম।’

দুটি গল্প। দুটি মহাদেশ। দুটি ভিন্ন সংস্কৃতি। একজনের জীবনে ছিল বর্ষার বৃষ্টি, অন্যজনের জীবনে ছিল তুষারের নীরবতা। কিন্তু দুজনের হৃদয়ের ব্যথা ছিল একই। কারণ ভালোবাসার কোনো দেশ নেই। বিশ্বাসের কোনো ভাষা নেই। আর প্রতারণার আঘাতের কোনো সীমান্ত নেই।

প্রেমে ব্যর্থ হওয়া জীবনের শেষ নয়। সব ভালোবাসার পরিণতি এক হয় না। কেউ জীবনের সঙ্গী হয়ে থাকে, কেউ স্মৃতি হয়ে থাকে। কিন্তু প্রতারণার অভিজ্ঞতা মানুষকে অন্যভাবে বদলে দেয়। সেখানে মানুষ শুধু একজন মানুষকে হারায় না, হারায় নিজের সরল বিশ্বাসের একটি অংশ।

তবুও জীবন থেমে থাকে না। ভাঙা হৃদয় একদিন আবার ভালো হয়ে যায়। মানুষ আবার হাসতে শেখে, আবার ভালোবাসতে শেখে, আবার নতুন স্বপ্ন দেখতে শেখে। কিন্তু প্রতারণা মানুষকে যে শিক্ষা দেয়, তা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সঙ্গে থাকে। কারণ ভালোবাসা মানুষকে কোমল করে, আর বিশ্বাসভঙ্গ মানুষকে গভীর করে।

শেষ পর্যন্ত মানুষ শুধু এটুকুই বুঝতে শেখে, কাউকে ভালোবেসে হারানো কষ্টের, কিন্তু ভুল মানুষকে বিশ্বাস করে নিজের ভেতরের আলো হারিয়ে ফেলা আরও বড় কষ্ট। আর তখন দূর অতীত থেকে ভেসে আসে সেই নীরব উপলব্ধি, ‘কাজ নেই আর আমার ভালোবেসে, আমি তার ছলনায় ভুলবো না।’

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]

এমআরএম