আজকের পরিকল্পনা বেশ গোছানো। প্রথমে যাব নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বাড়ি। সেখান থেকে আলিপুর মিউজিয়াম। দিনের শেষ গন্তব্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মস্থান। আগের দিন দেখতে না পাওয়া জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি ক্ষণে ক্ষণে মন পোড়াচ্ছে। সকালের কলকাতা তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। রাস্তার পাশের পুরোনো ভবন, ধীরে ধীরে খুলতে থাকা দোকানপাট আর দূরে ট্রামের ঘণ্টার শব্দে শহরটা যেন আলস্য ঝেড়ে ফেলছে।
হোটেল থেকে বেরিয়ে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে এলাম। এখানকার তাজ চায়ের বেশ সুনাম। বাংলাদেশিরা এই চা খেতে রীতিমতো বুঁদ হয়ে থাকেন। সকালের নাস্তা সেরেই অনেকে এখানে ভিড় জমান। এক কাপ চা হাতে পেতে ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়। আট-দশ মিনিট অপেক্ষার পর হাতে এলো মাটির ছোট্ট ভাঁড়ে ধোঁয়া ওঠা চা। প্রথম চুমুকেই মাটির সোঁদা গন্ধের সঙ্গে মিশে গেল দুধ-চায়ের ঘন স্বাদ। কলকাতার সকাল যেন এই ভাঁড়ের চায়ের মধ্যেই আটকে আছে।
চায়ে চুমুক দিতে দিতেই কয়েকজন বাঙালির সঙ্গে পরিচয় হলো। কেউ এসেছেন চিকিৎসা নিতে, কেউ ঘুরতে, কেউবা ব্যবসার কাজে। মাঝেমধ্যেই কলকাতায় আসতে হয় তাদের। তাজ চায়ের সঙ্গে তাই এক ধরনের সখ্য গড়ে উঠেছে। এই চায়ে চুমুক না দিলে তাদের সকালটাই যেন জমে না। চা শেষ করে বিদায় নিলাম।
ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ধরে পার্ক স্ট্রিটের দিকে হাঁটছি। আচমকাই পাশ থেকে এক টানা রিকশাচালকের ডাক এলো।
‘কোথায় যাবে দাদা?’
‘পার্ক স্ট্রিট।’
‘এসো, আমার রিকশায় ওঠো। সকাল থেকে একজনকেও টানতে পাইনি।’
‘না, প্রয়োজন হবে না। হেঁটেই চলে যেতে পারব।’
‘না না দাদা, তোমরা না চড়লে তো আমার না খেয়ে মরতে হবে!’
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বৃদ্ধের কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। এই রিকশায় যে উঠব, আমাকে টানতে তার যথেষ্ট কষ্ট হবে। কিন্তু জীবিকার বাস্তবতা অনেক সময় যুক্তির চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত উঠে বসলাম। হাতল দুটো তুলে কাঁধে ভর করলেন তিনি। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল রিকশা।
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৯
টানা রিকশা নিয়ে আমার কৌতূহল বহু দিনের। বাহনটির যেমন ঐতিহ্য আছে, তেমনি বিতর্কও কম নয়। উনিশ শতকের শেষ দিকে জাপানের ‘জিনরিকশা’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রিটিশরা এই বাহন ভারতে নিয়ে আসে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্বার্থে হিমাচলের সিমলায় আনা হয়। পরে তা ধীরে ধীরে কলকাতায় চলে আসে। প্রথম দিকে মূলত চীনা ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে এর ব্যবহার দেখা যেত। পরে ধীরে ধীরে উত্তর ও মধ্য কলকাতার সরু গলি, জলাবদ্ধ রাস্তা আর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এটি অপরিহার্য হয়ে ওঠে। একসময় অভিজাতদের পালকির জায়গা দখল করেছিল এই রিকশা। আজ এটি মূলত শহরের স্মৃতি, সংগ্রাম আর জীবিকার প্রতীক।

কলকাতার অধিকাংশ টানা রিকশাচালকই বিহার ও ঝাড়খণ্ড থেকে আসা শ্রমজীবী মানুষ। বয়সের ভার, দারিদ্র্য আর সীমিত দক্ষতার কারণে অনেকের পক্ষেই অন্য পেশায় যাওয়া সম্ভব হয়নি। প্রায় দেড়শ বছর ধরে টানা রিকশা কলকাতার নগরজীবনের অংশ হয়ে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ দিয়ে মানুষ টানানোর নৈতিক প্রশ্নও বহুদিন ধরে বিতর্ক উসকে দিচ্ছে।
রাজ্য সরকার অবশ্য হাতে টানা রিকশা বিলুপ্তের অনেক চেষ্টাও করেছিল। সরকারের যুক্তি ছিল, আধুনিক সমাজে একজন মানুষ আরেকজনকে টেনে নিয়ে যাবে এটা বড্ড অমানবিক। সে কারণে আইনও পাশ করা হয়েছিল। কিন্তু রিকশা মালিক ও শ্রমিকদের অমতের কারণে এই রিকশা তুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
পার্ক স্ট্রিটের অনেক আগেই নামিয়ে দেওয়া হলো। এর বেশি যাওয়ার অনুমতি নেই টানা রিকশার। ভাড়া কত দেব জানতে চাইতেই চালক বললেন, ‘চল্লিশ রুপি।’ টাকা মিটিয়ে মেট্রো স্টেশনের দিকে পা বাড়ালাম।
আরও পড়ুন
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৮
স্টেশনের প্রবেশপথে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকালটা বেশ জমে উঠেছে। ফুটপাতে তখন অফিসগামী মানুষের তাড়া। স্কুলপড়ুয়ারা ছুটছে বিদ্যালয়ের দিকে। কর্মজীবী নারী-পুরুষ কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলেছেন। পার্ক স্ট্রিটের ঝলমলে রাতের রূপের সঙ্গে এই সকালের দৃশ্যের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। রাস্তা পেরিয়ে পার্ক স্ট্রিট মেট্রো স্টেশনে পৌঁছলাম। এপাশে পুরো মেট্রোপথই ভূগর্ভস্থ। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে চোখে পড়ল বড় অক্ষরে লেখা নির্দেশনা, ছবি তোলা নিষেধ। টোকেন গেটে ছুঁইয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে এলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেট্রো এসে থামল। দরজা খুলতেই ঠান্ডা কামরার ভেতরে ঢুকে জানালার পাশে জায়গা নিলাম।
কলকাতার মেট্রো ভ্রমণের আলাদা এক আবহ আছে। বাইরে যতই কোলাহল থাকুক, ট্রেন ছুটতে শুরু করলেই যেন শহরটা অন্য রূপ নেয়। ট্রেন পার্ক স্ট্রিট ছেড়ে এগিয়ে গেল। পরের স্টেশন ময়দান। এরপর রবীন্দ্র সদন। স্টেশনগুলোর নাম ভেসে আসছে স্পিকারে। প্রতিটি নামই যেন কলকাতার সংস্কৃতি, ইতিহাস আর রাজনীতির কোনো না কোনো অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

রবীন্দ্র সদন ছাড়ার পরই ঘোষণায় ভেসে এলো, পরবর্তী স্টেশন নেতাজি ভবন। যাত্রীরা ধীরে ধীরে দরজার কাছে ভিড় করতে শুরু করলেন। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। কয়েক সেকেন্ড পর ট্রেন থামল প্ল্যাটফর্মে। দরজা খুলতেই নেমে পড়লাম নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশনে। প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই চোখে পড়ল স্টেশনের দেওয়ালে নেতাজির ছবি। কয়েক মিনিট আগেও ছিলাম পার্ক স্ট্রিটের ব্যস্ত নগরজীবনের ভেতর। আর এখন দাঁড়িয়ে আছি এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে হাঁটা দূরত্বেই রয়েছে উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক ঠিকানা।
মেট্রোর প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এসকেলেটর বেয়ে ওপরে উঠতেই চোখে পড়ল ব্যস্ত রাস্তা। সকালের সূর্য মাত্র তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। ফুটপাতের টং দোকান, চায়ের কাপে ধোঁয়া আর পথচারীদের অবিরাম যাতায়াত। এলগিন রোডের দিকে হাঁটা ধরলাম। দূরত্ব খুব বেশি নয়। তবু প্রতিটি পদক্ষেপ যেন ইতিহাসের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। কয়েক মিনিট হেঁটে লালা লাজপত রায় সরণিতে পৌঁছলাম। সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে সাদামাটা এক বাড়ি। বাইরে ভারতের জাতীয় পতাকা উড়ছে। প্রবেশপথের নামফলকই জানিয়ে দিলো, গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। এই সেই বাড়ি, যেখান থেকে এক শীতের রাতে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।
আরও পড়ুন
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৭
ঘড়িতে তখন পৌনে ১০টা। দরজা খুলতে এখনো এক ঘণ্টা পনেরো মিনিট বাকি। নিরাপত্তারক্ষীর কাছ থেকে খবরটা শুনে খানিকটা হতাশই হতে হলো। এতটা পথ এসে গন্তব্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, অথচ ভেতরে ঢোকার উপায় নেই। হাতে বেশ খানিকটা সময়। আশপাশে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনাও নেই। তাই অপেক্ষা করাই একমাত্র ভরসা। কয়েকবার বাড়িটির চারপাশ ঘুরলাম। বাইরে থেকে যতটুকু দেখা যায়, ততটুকুই দেখার চেষ্টা করছি। এই বাড়ির দেওয়ালের দিকে তাকালেই মনে হয়, এগুলো কেবল ইট-সুরকি নয়; ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ঠিক ১১টায় গেটের তালা খুলে দেওয়া হলো। প্রশস্ত উঠান ঘিরে তৈরি ঐতিহ্যবাহী ভবনটি বাইরে থেকে যতটা সাধারণ মনে হয়, ভেতরে ঢুকলে ততটাই গভীর হয়ে ওঠে ইতিহাস। কাঁচে ঘেরা বিখ্যাত ওয়ান্ডারার গাড়িটির দিকে এগোতেই এক নারী নিরাপত্তাকর্মী ইশারায় মূল প্রবেশপথের দিকে যেতে বললেন। সেখানে একটি ছোট্ট কক্ষে লাইব্রেরি গড়ে তোলা হয়েছে। নেতাজিকে নিয়ে লেখা বই ও স্মারক বিক্রি হচ্ছে। এখান থেকেই সংগ্রহ করতে হয় প্রবেশ টিকিট। ছবি তোলার বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা শুনে মনটা কিছুটা খারাপ হলো। কিন্তু নিয়ম তো মানতেই হবে।
কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠছি। পেছনে একজন নিরাপত্তারক্ষী সবাইকে অনুসরণ করছেন। ওপরে উঠতে উঠতে ভাবছিলাম, এই পথেই হয়তো হেঁটেছেন নেতাজি। এই ঘরগুলোতেই হয়েছে স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা। ইতিহাস বলছে, ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি এ বাড়িতেই জন্ম নিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। ১৯০৯ সালে তাঁর বাবা জানকীনাথ বসু পরিবারের জন্য বাড়িটি নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে এটি শুধু একটি পারিবারিক বাসভবন নয়, স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রেও পরিণত হয়।

ঘুরে দেখতে শুরু করলাম পুরো ভবন। নেতাজির শয়নকক্ষ, পড়ার ঘর, ব্যবহৃত আসবাব, পোশাক, ব্যক্তিগত চিঠি, দুর্লভ আলোকচিত্র, আজাদ হিন্দ ফৌজের নথিপত্র, বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের দলিল, সবকিছু অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে। একটি গ্যালারিতে তুলে ধরা হয়েছে তাঁর ছাত্রজীবন, আইসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, চাকরি ছেড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেওয়া, কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ এবং ফরোয়ার্ড ব্লক গঠনের ইতিহাস।
আরও পড়ুন
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৬
আরেকটি গ্যালারিতে রয়েছে আজাদ হিন্দ সরকারের কর্মকাণ্ড, সিঙ্গাপুর ও বার্মায় তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির নানা স্মারক। দোতলার একটি কক্ষ থেকে রক্তরাঙা পায়ের ছাপ বাড়ির পেছনের সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেছে। পথটি দর্শনার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বলা হয়, এই পথ ধরেই একদিন বাড়ি ছেড়েছিলেন নেতাজি।
সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল একটি বিশেষ জায়গায়। সেটি হলো কালো রঙের জার্মান নির্মিত ওয়ান্ডারার গাড়ির সামনে। ১৯৪১ সালের সেই শীতের রাতে ভাতিজা শিশির কুমার বসুর সহায়তায় এই গাড়িতেই এলগিন রোডের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গোমো স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন নেতাজি। ইতিহাসে যা ‘দ্য গ্রেট এস্কেপ’ নামে পরিচিত।
সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর রোমাঞ্চকর অন্তর্ধানের ইতিহাস। গাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে গা শিউরে উঠল। ইতিহাস বইয়ে পড়া ঘটনা হঠাৎ করেই বাস্তব হয়ে উঠেছে। পুরো বাড়ি ঘুরে দেখতে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে গেল। নেতাজি ভবনের ইতিহাসঘেরা প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে আবার মেট্রোর পথে হাঁটলাম।

এবার গন্তব্য আলিপুর।
চলবে...
আরও পড়ুন
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৫
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৪
এসইউ








