আগের দিন অদেখার অতৃপ্তি নিয়েই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে ফিরেছিলাম। সরকারি ছুটির কারণে বন্ধ ছিল ইতিহাসের সেই দরজা। বহু প্রতীক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছেও কিছুই দেখা হয়নি। তাই আজ আবার ফিরছি সেই ঠিকানায়, যেখানে জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

দুপুরের সূর্য তখন ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসছে। যতীন দাশ পার্ক থেকে কলকাতার ব্যস্ত ভূগর্ভস্থ পথ ধরে মেট্রো ছুটে চললো উত্তর কলকাতার দিকে। কিছুক্ষণ পর এসে থামলো গিরিশ পার্ক স্টেশনে।

মূল সড়কে উঠে দক্ষিণ দিকে হাঁটছি। বৃষ্টিতে সড়কগুলো এখনো ভিজে আছে। দ্রুত হাঁটার কারণে জুতার কাঁদাগুলো প্যান্টের সঙ্গে লেগে যাচ্ছে। পুরোনো কলকাতার সরু গলি, শতবর্ষী বাড়ি আর ইতিহাসের গন্ধ মাখা দেওয়াল পেরিয়ে মদন চ্যাটার্জি লেন ধরে এগিয়ে গেলাম আমার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে। একসময় সামনে ভেসে উঠলো লালরঙা সেই পরিচিত অট্টালিকা, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। যেখান থেকে একদিন আগেই একরাশ হতাশা মুঠোবন্দি করে ফিরেছিলাম। আজ আবার সেই একই ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তবে এবার প্রবেশপথে কোনো তালা নেই। ইতিহাসের দরজা উন্মুক্ত, দর্শনার্থীদের জন্য অপেক্ষমান।

মূল ফটকে পৌঁছেই টিকিট কাউন্টারের সামনে ছোট্ট একটি লাইন চোখে পড়লো। বাংলাদেশসহ সার্কভুক্ত দেশের দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশমূল্য ৫০ রুপি। মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে চাইলে আলাদা করে আরও ৫০ রুপির ফটোগ্রাফি কুপন কাটতে হয়। তবে টিকিট হাতে পেলেই যে পুরো বাড়িতে ছবি তোলা যাবে, বিষয়টি কিন্তু তেমন নয়।

rabi

ঠাকুরবাড়ির অন্দরে প্রবেশের সময়ই কর্তব্যরত কর্মীরা জানিয়ে দিলেন, জাদুঘরের গ্যালারি এবং মূল ভবনের অধিকাংশ অংশে ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শতবর্ষী দলিল, দুর্লভ আলোকচিত্র, পাণ্ডুলিপি ও শিল্পকর্ম সংরক্ষণের স্বার্থেই এই কড়াকড়ি। তাই মোবাইল ফোন পকেটেই রেখে মন দিয়ে দেখতে হয় রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিটি কক্ষ। তবে বাইরের উঠান, ঠাকুরদালান, বারান্দা আর ভবনের বাহ্যিক সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করার সুযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১১

লালরঙা দোতলা অট্টালিকার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, উত্তর কলকাতার বুকে ইতিহাস যেন এখনো শ্বাস নিচ্ছে। জোড়াসাঁকোর এই ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস শুরু আঠারো শতকের শেষভাগে। ১৭৮৪-৮৫ সালের দিকে ঠাকুর পরিবারের পূর্বপুরুষ নীলমণি ঠাকুর এখানে বসতভিটা গড়ে তোলেন। পরে দ্বারকানাথ ঠাকুর ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে এটি পরিণত হয় বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে।

১৮৬১ সালের ৭ মে এই বাড়িতেই জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জীবনের দীর্ঘসময় এখানেই কেটেছে তাঁর। শুধু জন্ম নয়, ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট এই বাড়িতেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জন্ম থেকে মৃত্যু, রবীন্দ্রনাথের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো জড়িয়ে আছে এই বাড়ির প্রতিটি ইটের সঙ্গে।

বর্তমানে ঠাকুরবাড়ির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে রবীন্দ্রভারতী জাদুঘর। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতিষ্ঠিত হয় রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে এই জাদুঘর।

মহর্ষি ভবন থেকে প্রদর্শন শুরু করলাম। দোতলায় উঠেই কবির বিশ্রামের ঘর। রয়েছে তাঁর ব্যবহৃত আসবাব, ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন এবং পারিবারিক নানা নিদর্শন। এখানেই রয়েছে সেই কক্ষ, যেখানে রবীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ঘরটি এখনো যত্ন করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কবির জন্মস্থানকে বিশেষ নিরাপত্তা শেকলে বন্দি করে রাখা হয়েছে।

rabi

এরপর একে একে ঘুরে দেখলাম ঠাকুর পরিবারের বিভিন্ন সদস্যকে নিয়ে সাজানো গ্যালারিগুলো। দ্বারকানাথ ঠাকুর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ এই পরিবারের বহু গুণী মানুষের জীবন ও কর্ম তুলে ধরা হয়েছে এখানে।

দোতলার অধিকাংশ কক্ষই এখন রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভ্রমণের স্মৃতি বহন করে চলেছে। জাপান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, হাঙ্গেরিসহ বিভিন্ন দেশে তাঁর সফরের ছবি, চিঠিপত্র, বিরল আলোকচিত্র, বিভিন্ন দেশের দেওয়া উপহার, বই, পাণ্ডুলিপি এবং নানা স্মারক যত্ন করে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১০

প্রতিটি ঘরে ঢুকলেই বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বের নাগরিক। তাঁর চিন্তা, সাহিত্য ও দর্শন কীভাবে দেশ-কাল-সীমানা অতিক্রম করেছিল, সেই গল্পই যেন বলে এই গ্যালারিগুলো। একটি কক্ষে তাঁর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘গীতাঞ্জলি’র বিভিন্ন সংস্করণ, অন্য কক্ষে রয়েছে তাঁর আঁকা ছবির প্রতিলিপি। কোথাও দেওয়ালে টাঙানো তাঁর হাতে লেখা চিঠির অনুলিপি, কোথাও সংরক্ষিত রয়েছে বিরল আলোকচিত্র।

মূল ভবন ঘুরে বেরিয়ে এলাম পাশের মুক্তমঞ্চের দিকে। এখানেই রয়েছে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যমঞ্চ। বছরজুড়ে এই প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় নাটক, কবিতা আবৃত্তি, সেমিনার, স্মারক বক্তৃতা এবং রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠান। নাট্যমঞ্চের পাশ দিয়ে হাঁটতেই ভেসে এলো পরিচিত সুর। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা তখন রবীন্দ্রসংগীতের ক্লাসে ব্যস্ত। কারো হাতে তানপুরা, কেউ হারমোনিয়ামের সুরে তাল মেলাচ্ছে, আবার কেউ মনোযোগ দিয়ে শিখছেন উচ্চারণ আর সুরের সূক্ষ্মতা।

এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল তখন। যে মানুষটির গান, কবিতা আর দর্শন নিয়ে আজ পৃথিবীর নানা দেশে গবেষণা হয়, তাঁর জন্মভিটার আঙিনাতেই নতুন প্রজন্ম সেই উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এখানেই। এটি শুধু অতীতের স্মৃতি সংরক্ষণের জায়গা নয়, একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক পরিসর। যেখানে একই সঙ্গে ইতিহাসকে দেখা যায়, আবার ভবিষ্যৎকেও তৈরি হতে দেখা যায়।

rabi

ঠাকুরদালানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। এই উঠানেই একসময় বসত পারিবারিক অনুষ্ঠান, নাটকের মহড়া, সাহিত্যসভা আর সাংস্কৃতিক আয়োজন। এখানেই বেড়ে উঠেছিল এক শিশুর কল্পনার জগৎ, যে পরবর্তীতে হয়ে উঠেছিল বিশ্বকবি।

আরও পড়ুন

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৯

একদিন আগেও যে অতৃপ্তি নিয়ে ফিরে গিয়েছিলাম, আজ সেই অপূর্ণতা অনেকটাই পূরণ হলো। তবু মনে হলো, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি একবারে শেষ হওয়ার জায়গা নয়। এখানে বারবার ফিরতে হয়। কারণ এই বাড়ি শুধু রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বহন করে না, এটি বহন করে বাঙালির আত্মপরিচয়, ইতিহাস আর সংস্কৃতির দীর্ঘ পথচলার গল্প।

গিরিশ পার্ক থেকে মেট্রো ধরে আবার পার্ক স্ট্রিটে ফিরছি। এরই মধ্যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে কলকাতার আকাশে। দিনের ব্যস্ততা তখন রূপ বদলাতে শুরু করেছে। স্টেশন থেকে বের হতেই বুঝলাম, সকালের পার্ক স্ট্রিট আর সন্ধ্যার পার্ক স্ট্রিট যেন দুই ভিন্ন শহর।

ফুটপাত ধরে হাঁটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে গরম কাটি রোলের ধোঁয়া, অন্যদিকে সদ্য বেক করা কেক আর পেস্ট্রির সুবাস। পুরোনো ব্রিটিশ আমলের ভবনের নিচে জমেছে তরুণ-তরুণীদের আড্ডা, অফিস শেষে বন্ধুদের পুনর্মিলন আর পর্যটকদের ভিড়।

রাস্তার একপাশে কেউ অপেক্ষা করছে বিখ্যাত চেলো কাবাবের জন্য, অন্যপাশে কেউ ঢুকে পড়ছে বহু পুরোনো কোনো বারে। নিয়ন আলোর ঝলকে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে চারপাশের রূপ। রাত যত গভীর হয়, পার্ক স্ট্রিটের গতি যেন ততই বেড়ে যায়। আলো, শব্দ, মানুষের পদচারণা আর খাবারের গন্ধ মিলেমিশে তৈরি করে এক অনন্য আবহ। মনে হয়, শহরটা যেন ঘুমাতে ভুলে গেছে।

rabi

আরও পড়ুন

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৮

ট্রামের শহরের বুকের মধ্যে এই এক টুকরো রাস্তা আজও পুরোনো কলকাতার ঐতিহ্য আর আধুনিক নগরজীবনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত মিলনস্থল। আর সেই আলো ঝলমলে পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, কলকাতা এখনো তার গল্প বলা শেষ করেনি।

চলবে...

আরও পড়ুন

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৭

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৬

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৫

এসইউ