নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর: মাত্র পনেরো দিনের ব্যবধানে আবারও বৃষ্টির পানি গ্রাস করেছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা। দেশের প্রথম শ্রেণির পৌরসভাগুলোর একটি হলেও বাস্তবে নাগরিক সেবার চিত্র নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। বছরের পর বছর অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং খাল-নালা দখল করে স্থাপনা নির্মাণের ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো জলাবদ্ধতায় হাজারো পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়েছে। অভিযোগের তীর পৌর কর্তৃপক্ষের দিকে থাকলেও, পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন স্থানে ড্রেন ও নালা পরিষ্কারের কাজ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিশ্বাসপাড়া, হরিণহাটি, পল্লী বিদ্যুৎসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দুই দিনের টানা বর্ষণে রাস্তাঘাট, দোকানপাট ও অসংখ্য বসতবাড়ি এখনও পানির নিচে। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। কেউ কেউ আবার ঘরের বারান্দা বা ছাদের ওপর অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া জলাবদ্ধতায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত থমকে গেছে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে এবং পানির সঙ্গে শিল্পকারখানার দূষিত কালো বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। অনেকের শরীরে ইতোমধ্যে চর্মরোগের উপসর্গও দেখা দিয়েছে। পানির নিচে ডুবে থাকায় অধিকাংশ গভীর নলকূপ ও পানির পাম্পও অচল হয়ে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কর্মরত। কিন্তু ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে যাওয়ায় অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। এতে শ্রমিক সংকটের আশঙ্কায় শিল্প খাতেও প্রভাব পড়তে পারে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।

পৌরসভার বিশ্বাসপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও মুদি দোকান ব্যবসায়ী আলী হোসেন বলেন, “গত মাসের ১৬ তারিখের বৃষ্টিতে আমাদের এলাকা চার দিন পানির নিচে ছিল। কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। মানুষ টিভি, ফ্রিজ, ফার্নিচার রেখে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। সেই ক্ষতি সামলে উঠতেই আবার একই অবস্থা। এটা আল্লাহর অভিশাপ নাকি জানি না। পৌর কর্তৃপক্ষের বিষয়ে আর কী বলব? বিল্ডিংয়ের ট্যাক্স, মাসে মাসে ময়লার বিল, বছর বছর কর—সবই দিচ্ছি। কিন্তু শান্তিতে বসবাস করার মতো পরিবেশ পাচ্ছি না।”

একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, “আমি মনে করি এসবের জন্য দায়ী পৌরসভার কর্তারা। বৃষ্টি তো সারা দেশেই হয়, ঢাকাতেও হয়। কিন্তু সেখানে তো এভাবে দিনের পর দিন পানি জমে থাকে না। একবার চার দিন পানিতে ছিলাম, ১৫ দিনও পার হয়নি, আবার একই অবস্থা। আমরা তো হাওর এলাকায় থাকি না। সত্য কথা বললেই নানা ঝামেলা। তাই এখন এই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাই ভাবছি।”

হরিণহাটি এলাকার মুদি দোকান ব্যবসায়ী মতিউর রহমান বলেন, “আগের জলাবদ্ধতায় প্রায় দুই লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়েছে। এবারও গতকাল থেকে দোকানে পানি উঠেছে। তাই ভয়ে সব মালামাল মাথায় করে একটি বাড়ির ছাদে তুলে রেখেছি। আমরা নিয়মিত কর দিচ্ছি। তাহলে জনগণের সেই টাকার বিনিময়ে পৌরসভা কী করছে? আমাদের এই দুর্দশা কি তাদের চোখে পড়ে না?”

এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর কর্মকর্তা এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, “দুই দিনের বৃষ্টিতে আবারও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য লাগাতার কাজ চলছে। বৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকাতেই বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “এই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান করতে সময় লাগবে। অনেক খাল সরু হয়ে গেছে, অনেক ড্রেন অকেজো হয়ে আছে। যাঁরা এসব রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁদের নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে।”

The post কালিয়াকৈর এক মাসে দ্বিতীয়বার পানির দখলে appeared first on ZoomBangla.