প্রায় এক মাসের ব্যবধানে আবারো বৃষ্টির পানি গ্রাস করেছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা। দেশের প্রথম শ্রেণির পৌরসভাগুলোর একটি হলেও বাস্তবে নাগরিক সেবার চিত্র নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং খাল-নালা দখল করে স্থাপনা নির্মাণের ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে এই পৌরসভার সাধারণ মানুষকে।
স্থানীয়রা জানান, কয়েকদিনের বৃষ্টিতে দ্বিতীয়বারের মতো জলাবদ্ধতায় হাজারো পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়েছে। অভিযোগের তীর পৌর কর্তৃপক্ষের দিকে থাকলেও, পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন স্থানে ড্রেন ও নালা পরিষ্কারের কাজ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আরো পড়ুন: দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতে পানির নিচে কালিয়াকৈর
পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিশ্বাসপাড়া, হরিণহাটি, পল্লী বিদ্যুৎসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দুইদিনের টানা বর্ষণে রাস্তাঘাট, দোকানপাট ও অসংখ্য বসতবাড়ি এখনো পানির নিচে। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন। কেউ কেউ আবার ঘরের বারান্দা বা ছাদের ওপর অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া জলাবদ্ধতায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত থমকে গেছে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে এবং পানির সঙ্গে শিল্পকারখানার দূষিত কালো বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। অনেকের শরীরে ইতোমধ্যে চর্মরোগের উপসর্গও দেখা দিয়েছে। পানির নিচে ডুবে থাকায় অধিকাংশ গভীর নলকূপ ও পানির পাম্পও অচল হয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কর্মরত। ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে শ্রমিক সংকটের আশঙ্কায় শিল্প খাতেও প্রভাব পড়তে পারে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
পৌরসভার বিশ্বাসপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও মুদি দোকান ব্যবসায়ী আলী হোসেন বলেন, “গত মাসের ১৬ তারিখের বৃষ্টিতে আমাদের এলাকা চারদিন পানির নিচে ছিল। কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। মানুষ টিভি, ফ্রিজ, ফার্নিচার রেখে বাড়ি ছেড়ে যান। সেই ক্ষতি সামলে উঠতেই আবার একই অবস্থা।”
তিনি বলেন, “এটা আল্লাহর অভিশাপ নাকি জানি না। পৌর কর্তৃপক্ষের বিষয়ে আর কী বলব? বিল্ডিংয়ের ট্যাক্স, মাসে মাসে ময়লার বিল, বছর বছর কর- সবই দিচ্ছি; কিন্তু শান্তিতে বসবাস করার মতো পরিবেশ পাচ্ছি না।”
একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, “আমি মনে করি এসবের জন্য দায়ী পৌরসভার কর্তারা। বৃষ্টি তো সারা দেশেই হয়, ঢাকাতেও হয়। কিন্তু সেখানে তো এভাবে দিনের পর দিন পানি জমে থাকে না। একবার চারদিন পানিতে ছিলাম, আবার একই অবস্থা। আমরা তো হাওর এলাকায় থাকি না। সত্য কথা বললেই নানা ঝামেলা। তাই এখন এই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাই ভাবছি।”
হরিণহাটি এলাকার মুদি দোকান ব্যবসায়ী মতিউর রহমান বলেন, “আগের জলাবদ্ধতায় প্রায় দুই লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়েছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) দোকানে পানি উঠেছে। তাই ভয়ে সব মালামাল মাথায় করে একটি বাড়ির ছাদে তুলে রেখেছি। আমরা নিয়মিত কর দিচ্ছি। তাহলে জনগণের সেই টাকার বিনিময়ে পৌরসভা কী করছে? আমাদের এই দুর্দশা কি তাদের চোখে পড়ে না?”
এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, “দুইদিনের বৃষ্টিতে আবারো পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য লাগাতার কাজ চলছে।”
তিনি বলেন, “এই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান করতে সময় লাগবে। অনেক খাল সরু হয়ে গেছে, অনেক ড্রেন অকেজো হয়ে আছে। যারা এসব রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে।”








